শিরোনাম
তারেকুজ্জামান শিমুল, বিবিসি নিউজ বাংলা
প্রকাশ: ০৮:৪০, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০৯:০৮, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রতীকি ছবি: বিবিসি নিউজ বাংলার সৌজন্যে।
খাতা-কলমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমপর্ণ করলেও এর পরও বাংলাদেশের অনেক এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওইসব এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানালে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধ তীব্র হয়।
খণ্ড খণ্ড এসব যুদ্ধের মাধ্যমে সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সময় লেগে যায় আরও এক সপ্তাহ।
তবে বিজয়ের সেই আনন্দ উদযাপন করার আগেই তা বিষাদে পরিণত হয় শত শত বুদ্ধিজীবী হত্যা খবরে। সারা দেশে সন্ধান মিলতে থাকে একের পর এক বধ্যভূমি ও গণকবরের।
এদিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে ভেঙে পড়ে। বেড়ে যায় চুরি-ছিনতাই, লুটপাট-ডাকাতির ঘটনা।
কলকাতা থেকে মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীরা ঢাকায় ফিরতে ২২শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
এর মাঝের কয়েকদিন দেশ কীভাবে চলবে এবং কীভাবে সারাদেশে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে, সেটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয় প্রবাসী সরকারের কাছে।
অন্যদিকে, ভারতীয় সেনারা নিজ দেশে ফিরে না যাওয়ায় জনমনে দেখা যায় সন্দেহ-সংশয়, জন্ম নেন নানান প্রশ্ন।
এরই মধ্যে ডিসেম্বরের শেষদিকে ২৪ ঘণ্টার আকস্মিক সফরে ঢাকা আসেন ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর তৎকালীন প্রধান সেনাপতি জেনারেল শ্যাম মানেকশ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরের দুই সপ্তাহে এ ধরনের আরও অনেক ঘটনা ঘটতে থাকে, যা সেই সময়কার বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও বইপত্র থেকে জানা যায়।
সেগুলোর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত কিছু ঘটনার বর্ণনা বিবিসি বাংলার পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো।
বধ্যভূমি ও গণকবরের সন্ধান
পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই বিজয়ের আনন্দ রীতিমত বিষাদে পরিণত হয়।
১৭ই ডিসেম্বর জানা যায়, আত্মসমপর্ণের আগে পাকিস্তানি সেনারা পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ শত শত বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে।
ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ মিলতে থাকে একের পর বধ্যভূমি ও গণকবরের।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যানুসারে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সবমিলিয়ে সারা দেশে এগারো শ' জনের বেশি বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় দেড়শ' জনই হত্যার শিকার হয়েছিলেন ঢাকায়, যাদের বেশিরভাগেরই মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে।
ঘটনাটিকে তখন "মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড" বলে বর্ণনা করেছিল দৈনিক ইত্তেফাক।
"শুক্রবার (১৭ই ডিসেম্বর) অপরাহ্নে ঢাকার কতিপয় সাংবাদিক কোন এক সূত্রে আভাস পাইয়া এই বধ্যভূমিতে গিয়া ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের আলামত দেখিতে পান," ১৯৭১ সালের ১৯শে ডিসেম্বর প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বধ্যভূমির পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় গণকবরেরও সন্ধান মিলতে থাকে।
বিজয়ের আনন্দের মধ্যে একের পর এক বধ্যভূমি ও গণকবরের খবর সামনে আসতে থাকায় সেসময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটির বর্ণনা দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিল দৈনিক পূর্বদেশ।
"রক্তস্নাত বাংলাদেশ কাঁদো" শিরোনামের ওই খবরে বলা হয়েছে, "স্রোতস্বিনী পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পানি আমাদের প্রিয়জনদের রক্তে লাল হয়ে গেছে। একদিকে স্বাধীনতার আনন্দ, অন্যদিকে লাখো মানুষের আত্মহুতি।"
খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ
একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করলেও কিছু কিছু এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
খণ্ড খণ্ড যুদ্ধের মাধ্যমে পরবর্তী এক সপ্তাহে ওইসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা।
বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস' গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তা মেনে নিতে রাজি হননি পাকিস্তানি ১০৭ নম্বর ব্রিগ্রেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান। চার হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি খুলনা অঞ্চলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকেন।
তখন আট নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা একযোগে আক্রমণ শুরু করলে ১৭ই ডিসেম্বর দুপুরে খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে পাকিস্তানি সেনারা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
একইভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধের পর ১৭ই ডিসেম্বর বাগেরহাট, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী ও রাঙ্গামাটি; ১৮ই ডিসেম্বর পাবনা, নওগাঁ, সৈয়দপুর ও রাজবাড়ী; ১৯শে ডিসেম্বর ভৈরব ও পাবনার ঈশ্বরদী; ২১শে ডিসেম্বর নাটোর এবং ২৩শে ডিসেম্বর কুমিল্লার হোমনা উপজেলা পুরোপুরিভাবে মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে এই ভূ-খণ্ডে তাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ভেঙে পড়ে। ফলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সবক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাটা জরুরি হয়ে পড়ে।
কীভাবে সেটি করা হবে, সেটা অবশ্য দেশ স্বাধীন হওয়ার আগই পরিকল্পনা করে রেখেছিল তৎকালীন মুজিবনগর সরকার।
ওই সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন হোসেন তৌফিক ইমাম, যিনি এইচ টি ইমাম নামেও পরিচিত।
মি. ইমাম তার লেখা 'বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১' গ্রন্থে লিখেছেন যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজধানী দ্রুত ঢাকায় স্থানাস্তরের পরিকল্পনা করা হয়।
"শত্রু আত্মসমর্পণ করলে আমরা কত দ্রুত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করব ঢাকায়? এই স্থানান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম প্রশ্ন: নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তা। সেটি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আমরা কোন ঝুঁকি নিতে পারি না। অতএব, সমরনায়কদের পরে প্রথম ব্যাচে যাবেন সচিববৃন্দ। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিবর্গ ঢাকা থেকে সিগন্যাল পাওয়ার পরে যাবেন," নিজের বইতে লিখেছেন মি. ইমাম।
মি. ইমাম তার গ্রন্থে আরও লিখেছেন, "১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর সারাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে আরও কয়েকদিন প্রয়োজন ছিল। আমাদের প্রধানতম কাজ ছিল রাজধানী ঢাকা, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম, বিভাগীয় শহরগুলি এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলি কাল বিলম্ব না করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়া। একই সাথে সচিবালয় ও সারাদেশে বিভিন্ন দপ্তরে বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করা।"
প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিটি জেলায় ডেপুটি কমিশনার এবং পুলিশ সুপার নিয়োগ করে তাদের কর্মস্থলে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্যও কর্মকর্তাদের বাছাই করা হয়, যাতে তারা কয়েক ঘণ্টার নোটিশে কাজে যোগ দিতে পারেন।
"নবনিযুক্ত ডেপুটি কমিশনার ও এসপিদের স্বাধীন বাংলা বেতার এবং টেলিগ্রাম মারফত সরাসরি নির্দেশ দিতে আরম্ভ করি। টাইপ করার সময় না থাকায় এই সময় সরাসরি হাতে লিখে নির্দেশ দিতে থাকি," এইচ টি ইমাম উল্লেখ করেছেন তার 'বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১' গ্রন্থে।
মুজিবনগর সরকারের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন
ঢাকা বিমানবন্দর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তারা ঢাকায় ফিরতে শুরু করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় সপ্তাহখানেকের মাথায় ২২শে ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তৎকালীন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থ-বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ।
ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে নামার পর বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নেয় বলে তখনকার পত্রপত্রিকার খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির আদর্শে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে বলে বিমানবন্দরে নামার পর দেওয়া প্রথম ভাষণে বলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
শোষণমুক্ত সমাজের পথে কাউকে বাধা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।
শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের সামরিক সরকারের প্রতি আহ্বান জানান মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীরা।
প্রবাসী সরকারের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী মুজিবনগর থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়।