ঢাকা, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

১৮ ফাল্গুন ১৪৩২, ১২ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম

Scroll
যানজট নিরসনে ও ট্রাফিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী
Scroll
ঢাবিতে ‘গরুর মাংস’ ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের পাশে সাদা দল
Scroll
হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে বৈরুতে ইসরাইলের হামলা
Scroll
ঢাকাসহ দেশের ৫ বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা
Scroll
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের মধ্যে ওপেক প্লাস দেশগুলোর তেল উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণা
Scroll
বললেন ট্রাম্প, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ৪ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে
Scroll
’সব লক্ষ্য পূরণ না হওয়া’ পর্যন্ত ইরান অভিযান অব্যাহত থাকবে: ট্রাম্প
Scroll
পত্রিকা: ’বিমানবন্দরে আটকা হাজারো যাত্রী, তীব্র দুর্ভোগ’
Scroll
ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে: মির্জা ফখরুল
Scroll
ইরানের পরিস্থিতিতে স্থগিত ফ্লাইট পুনঃনির্ধারণে সরকারের নজরদারি
Scroll
মধ্যপ্রাচ্যে গমনেচ্ছুদের সহায়তায় মন্ত্রণালয়ের হটলাইন চালু
Scroll
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ
Scroll
শীর্ষ সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়া হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
Scroll
খামেনির মৃত্যু: করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ, গুলিতে নিহত ৯
Scroll
ইরানে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানাল বাংলাদেশ
Scroll
ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালকে ৫শ’ বেডে উন্নীত করা হবে : মির্জা ফখরুল
Scroll
রমজানের পরই সিটি করপোরেশন নির্বাচন : ইসি আব্দুর রহমানেল মাছউদ
Scroll
দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার মাত্র ১৩ দিনেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি
Scroll
প্রধানমন্ত্রী ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মাঝেও বাংলাদেশিদের খোঁজ রাখছেন
Scroll
মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক শেয়ার বাজারে দরপতন, তেলের দাম বাড়তি

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর কী ঘটেছিলো ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে-বাইরে

রাকিব হাসনাত, বিবিসি নিউজ বাংলার সৌজন্যে

প্রকাশ: ০৯:২৪, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০৯:২৫, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর কী ঘটেছিলো ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে-বাইরে

ঢাকায় যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করছেন পাকিস্তানের জেনারেল এ কে নিয়াজী। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে।


উনিশশো একাত্তর সালের ষোলই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলেও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ সে খবর জেনেছিল আরও পরে রেডিওর মাধ্যমে। যদিও বেশ কিছু মানুষ রেসকোর্স ময়দানে ওই অনুষ্ঠান দেখারও সুযোগ পেয়েছিল।

ওই দিন বেলা ১২টার দিকেই যারা ভারতীয় বাহিনীকে ঢাকায় প্রবেশ করতে দেখছিল, তারা অবশ্য রাস্তায় নেমে এসেছিল। পাশাপাশি ঢাকায় আগে থেকেই আত্মগোপনে থাকা মুক্তিবাহিনীর সদস্যরাও বাইরে বের হয়ে আসে।

গবেষকদের মতে, 'সারেন্ডার বা আত্মসমর্পণ' কীভাবে হবে তা নিয়ে উদ্বেগ বা শঙ্কা থাকলেও ঢাকায় ভারতীয় বাহিনী প্রবেশ করার পর বিজয় যে এসে গেছে, তা নিয়ে কার্যত আর কারও মধ্যেই কোনো সংশয় ছিলো না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তাঁর 'বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি ১৯৭১-২০১১' বইয়ে ১৬ই ডিসেম্বরের তথ্য দিয়ে লিখেছেন যে, ওই দিন সকাল ১০ টা ৪০ মিনিটে মিত্রবাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করে।

"ওদিকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের প্রবেশ। ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে বিকেল ৫টায় ভারত ও বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের শর্তহীন আত্মসমর্পণ। মেজর জেনারেল জ্যাকবের প্রস্তুত করা আত্মসমর্পণ দলিলে লে. জে নিয়াজী ও লে. জে অরোরা স্বাক্ষর করেন," লিখেছেন তিনি।
বিবিসিতে ১৯৭১ সালের ২২শে ডিসেম্বর অ্যালান হার্ট এর একটি তথ্যচিত্র প্রচার হয়। এতে দেখা যায়, মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা বেরিয়ে আসছে আর লোকজন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবের নামে কিংবা জয় বাংলা শ্লোগান দিচ্ছিল।

রিপোর্টের ফুটেজে দেখা যায়, বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করছে মানুষ। যদিও তখনো কোথাও কোথাও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিলো এবং এরই এক পর্যায়ে ভারতীয় বাহিনী শহরে প্রবেশ করলে লোকজন তাদের নিয়েও উল্লাস করতে থাকে।

গবেষকরা বলছেন, ক্যান্টনমেন্টে যখন আত্মসমর্পণের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত হচ্ছিলো তখনো বাইরে বহু মানুষই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে আসলে কি হতে যাচ্ছে। সেদিনই যে আত্মসমর্পণ হয়ে যাচ্ছে ও বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মুক্ত হচ্ছে তা সাধারণ মানুষের অনেকের কাছেই পরিষ্কার হয়নি তখনো।
লেখক ও গবেষক মফিদুল হক বলছেন, ক্যান্টনমেন্টে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল গন্দর্ভ সিং নাগরা ও পাকিস্তানের মেজর জেনারেল জামশেদসহ দু'পক্ষের বৈঠক হচ্ছিলো, আর বাইরে ছিল উদ্বেগ আর আশংকা যে কীভাবে সারেন্ডার হবে।

"ওই আলোচনা চলাকালেই ভারতীয় বাহিনী ঢাকায় ঢুকতে শুরু করলো। তাদের যারা আসতে দেখলো তারাও রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করলো। ঢাকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধারাও বের হয়ে আসলো," ষোলই ডিসেম্বরের ঢাকার বর্ণনা দিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আরেকজন গবেষক ও প্রত্যক্ষদর্শী আফসান চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যে, ক্যান্টনমেন্টে কী হচ্ছে সেটি মানুষের জানা ছিলো না, বরং মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় ফোর্সকে ঢাকার রাস্তায় দেখেই চিৎকার করছিলো আর জয় বাংলা শ্লোগান দিচ্ছিলো।

"মুক্তিযোদ্ধারা মূলত পুরো ডিসেম্বর জুড়েই চারদিক থেকে ঢাকায় ঢুকেছে। পাকিস্তান আর্মি সারেন্ডার করেছে ও হেরে গেছে, আর মানুষ মুক্তি পেয়েছে। বিশাল স্বস্তি পেয়েছিলো মানুষ। তারা তো আর কিছু জানতো না। সারেন্ডারের খবর পরে রেডিওতেই পেয়েছিলো সবাই," বলছিলেন মি. চৌধুরী।

ষোলই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিজের বাহিনীর সাথে ঢাকায় প্রবেশ করেছিলেন প্রয়াত সেনা কর্মকর্তা মইনুল হোসেন চৌধুরী।

ঢাকার দৈনিক প্রথম আলোতে পরে এক লেখায় তিনি লিখেছিলেন, "সন্ধ্যায় আমরা ঢাকা স্টেডিয়ামে পৌঁছি। স্টেডিয়ামের পথে পথে রাস্তাঘাট ছিল জনশূন্য। যদিও পাকিস্তানি আর্মি আত্মসমর্পণ করেছিল তথাপি লোকজনের মধ্যে ভয়ভীতি, আতঙ্ক ও সন্দেহ ছিল। তাই রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল ছিল না"।
ক্যান্টনমেন্টে কী হচ্ছিল
ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের কমান্ডার লে. জে. আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেছিলেন বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের যৌথ নেতৃত্বের কাছে।

আর এই আত্মসমর্পণ নিয়ে সকাল থেকেই ক্যান্টনমেন্টে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল গন্দর্ভ সিং নাগরা ও পাকিস্তানের মেজর জেনারেল জামশেদসহ দুপক্ষের মধ্যে।

একাত্তরের তেসরা ডিসেম্বর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। এর আগেই অনেক জায়গায় তাদের পতন হয়ে গিয়েছিলো।

আটই ডিসেম্বর ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ প্রথমবারের মত পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের আহবান জানান।

মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ ছিলেন লে. জে. জে এফ আর জ্যাকব। তিনি তার সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা বইতে লিখেছেন, "১৬ই ডিসেম্বর সকাল সোয়া নয়টায় জেনারেল মানেকশ ফোনে আমাকে অবিলম্বে ঢাকায় গিয়ে সেই দিনই সন্ধ্যার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে বলেন"।

মি. জ্যাকবের বই ছাড়াও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের লেখা 'উইটনেস টু সারেন্ডার' এবং তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী খানের "হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড" বইতেও ওই দিন ক্যান্টনমেন্টে যা যা ঘটেছে এবং এরপর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

বিভিন্ন বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন সকালে ঢাকায় থাকা পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তারা তাদের দপ্তরে যখন বৈঠক করছিলেন তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল গন্দর্ভ সিং নাগরার একটি লিখিত বার্তা এসে পৌঁছায় সেখানে।

ওই বার্তায় লেখা ছিল, "প্রিয় আবদুল্লাহ, আমি এখন মিরপুর ব্রিজে। আপনার প্রতিনিধি পাঠান।"

এর আগে সকাল আটটা নাগাদ ঢাকার মিরপুর ব্রিজের কাছে মেজর জেনারেল নাগরাকে বহনকারী একটি সামরিক জিপ এসে থামে।

এরপর জেনারেল নাগরাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য মেজর জেনারেল জামশেদকে পাঠানো হলো এবং মিরপুর ব্রিজের কাছে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যদের জেনারেল নাগরাকে নিরাপদে শহরে ঢুকতে দেয়ার আদেশ দেয়া হলো।

বিষয়টির বর্ণনা দিয়ে সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, "ভারতীয় জেনারেল হাতে গোনা সৈন্য এবং অনেক গর্ব নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করলেন। তখনই কার্যত ঢাকার পতন হয়ে গেলো।"

জেনারেল নাগরা কমান্ড অফিসে পৌঁছানোর পর জেনারেল নিয়াজী তাঁর সাথে কৌতুকে মেতে উঠেন।

সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, সেসব কৌতুক এতটাই নোংরা ও ভাষার অযোগ্য ছিল যে সেগুলো বইয়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

সে মুহূর্তের বর্ণনা জেনারেল রাও ফরমান আলী খান তুলে ধরেছেন এভাবে, " জেনারেল নিয়াজি তার চেয়ারে বসে আছেন, তার সামনে জেনারেল নাগরা রয়েছেন এবং একজন জেনারেলের পোশাকে রয়েছেন মুক্তিবাহিনীর টাইগার সিদ্দিকীও (কাদের সিদ্দিকী)। শুনলাম নিয়াজি নাগরাকে জিজ্ঞেস করছেন তিনি উর্দু কবিতা বোঝেন কিনা"।

ইতোমধ্যে ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল জে আর জ্যাকব ঢাকায় অবতরণ করেছেন। তিনি সাথে এনেছেন আত্মসমর্পণের দলিল, যা তিনি পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেন।

কিন্তু মি. নিয়াজী একে বর্ণনা করছিলেন 'যুদ্ধ বিরতির খসড়া প্রস্তাব' হিসেবে।

আত্মসমর্পণ দলিলে "ভারতীয় যৌথ কমান্ড এবং বাংলাদেশ বাহিনীর" কাছে আত্মসমর্পণ করছে পাকিস্তান বাহিনী- এমন বাক্য থাকায় রাও ফরমান আলী আপত্তি জানান।

এসময় জেনারেল জ্যাকবের সঙ্গে থাকা ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্নেল খেরা শুধু বলেন, "এটা বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আপনারা শুধু ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করছেন"।

জে আর এফ জ্যাকবের লেখা বইতেও এ বিষয়ে এভাবে উঠে এসেছে, "আমি নিয়াজীর অফিসে ফিরে এলে কর্নেল খেরা আত্মসমর্পণের শর্তাবলী পাঠ করে শোনান। নিয়াজির চোখ থেকে দরদর করে পানি পড়তে থাকে, সেই সাথে ঘরে নেমে আসে পিনপতন নিস্তব্ধতা। রাও ফরমান আলী ভারতীয় ও বাংলাদেশি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানান। নিয়াজি বলেন যে, আমি তাকে যেটাতে সই করতে বলছি সেটাই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিল"।
দুপুরের পর জেনারেল নিয়াজী ঢাকা বিমানবন্দরে গেলেন ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জগজিৎ সিং অরোরাকে অভ্যর্থনা জানাতে। মি: অরোরা স্ত্রীকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন।

ততক্ষণে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। আর বারোটার পর থেকেই ভারতীয় বাহিনী ধীরে ধীরে শহরে প্রবেশ করতে শুরু করে।

রাও ফরমান আলীসহ আরও একজন কর্মকর্তা মি. নিয়াজীকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়ার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি তা শুনতে রাজি হননি।

জেনারেল অরোরা এবং জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের পর মি. নিয়াজী তার রিভলবারটি মি. অরোরার হাতে তুলে দেন।

মি. জ্যাকব সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা বইতে লিখেছেন, "সময় তখন বিকেল চারটা পঞ্চান্ন মিনিট। এরপর নিয়াজী তার কাঁধ থেকে এপ্যলেট (সেনা অধিনায়কদের সম্মানসূচক ব্যাজ) খুলে ফেলেন এবং ল্যানিয়ার্ড (একটি ছোট দড়িবিশেষ) সহ পয়েন্ট ৩৮ রিভলবার অরোরার হাতে ন্যস্ত করেন। তার চোখে অশ্রু দেখা যাচ্ছিলো। সন্ধ্যা হয়ে আসছিলো। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা তখন নিয়াজী বিরোধী ও পাকিস্তানবিরোধী শ্লোগান ও গালিগালাজ করতে থাকে"।

পরে জেনারেল নিয়াজী ও ঊর্ধ্বতন কমান্ডারদের ২০শে ডিসেম্বর কলকাতায় নিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
ক্যান্টনমেন্টের বাইরের পরিস্থিতি
ক্যান্টনমেন্টে যখন পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের খুঁটিনাটি ঠিক হচ্ছিল তখন সেটি বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিলো না।

মফিদুল হক অবশ্য বলছেন যে, তার আগেই বেলার ১১টার দিকেই তারা বুঝতে পারছিলেন যে যুদ্ধ শেষ হচ্ছে। তিনি তার আত্মীয়ের গাড়িতে করে বেরিয়েছিলেন সেদিন।

বেলা ১২টার দিকে ভারতীয় বাহিনীর এসে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আসতে দেখেছেন তিনি।

পরে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তারা যখন বিমানবন্দরে যান ততক্ষণে আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হেলিকপ্টারে ঢাকা ছাড়ছিলেন ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জগজিৎ সিং অরোরা।

ওদিকে শহরের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীদের যেসব বর্ণনা বিভিন্ন সময়ে সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে তাতে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের গান আর শহড়জুড়ে আনন্দ করছিলো মানুষ। অনেককে মিষ্টি বিতরণ করতেও দেখা গেছে।

বিশেষ করে বিকেলে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাইফেলের ফাঁকা গুলি আর শ্লোগানে প্রকম্পিত হতে থাকে তখনকার ঢাকা শহর।

সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসে আনন্দ উল্লাস করতে থাকে।

তবে এর মধ্যেও কোথাও কোথাও গোলাগুলি হচ্ছিল। ইন্টারকন্টিনালের সামনে গোলাগুলিতে একজন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া যায় কোনো কোনো লেখায়।

বিশেষ করে মিরপুরের কিছু এলাকায় গুলি, নয়াবাজার এলাকায় আগুন ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলি হচ্ছিল তখনো।

এর মধ্যেই বিভিন্ন পাড়া মহল্লা থেকে আসতে থাকে মিছিল এবং ধ্বনিত হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান 'জয় বাংলা'।

"মানুষ তখন মুক্তির আনন্দে উল্লসিত। দেশ আসলেই স্বাধীন হলো। তবে একদিন পর থেকেই আইন শৃঙ্খলার অবনতি হতে শুরু করে," বলছিলেন গবেষক আফসান চৌধুরী।
 

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন