ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:১১, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১০:১৫, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানকে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে এবং যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের শর্তাবলী মেনে নিতে বাধ্য করার প্রচেষ্টায় মার্কিন নৌবাহিনী এই পদক্ষেপ নিয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এই যুদ্ধ চলছে, খবর ইউরো নিউজের।
ভেসেল ট্র্যাকার ‘মেরিন ট্রাফিক’ সোমবার রাতে এক্স-এ (সাবেক টুইটার) করা একটি পোস্টে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শুরুর পরপরই প্রণালীর দিকে এগিয়ে আসা অন্তত দুটি ট্যাঙ্কার পথ পরিবর্তন করে ফিরে গেছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এজেন্সি জানিয়েছে, এই অবরোধের ফলে বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোসহ সমগ্র ইরানি উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
নাবিকদের জন্য জারিকৃত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে যে, ইরান ছাড়া অন্য কোনো স্থানের উদ্দেশ্যে বা অন্য কোনো স্থান থেকে আসা জাহাজ চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে এসব জাহাজ চলাচলের সময় "সামরিক উপস্থিতি" দেখতে পেতে পারে।
হোয়াইট হাউসে অবরোধ শুরুর ঘোষণা দেওয়ার সময় ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, "আমরা কোনো দেশকে, পুরো বিশ্বকে ব্ল্যাকমেইল বা জিম্মি করতে দিতে পারি না, কারণ তারা এখন সেটাই করছে।" তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের সাথে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। ট্রাম্প বলেন, "আমি আপনাদের বলতে পারি যে অন্য পক্ষ থেকে আমাদের কাছে ফোন এসেছে। তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়।"
দুইজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির তথ্যমতে, ওয়াশিংটন এবং ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সরাসরি আলোচনা নিয়ে প্রস্তুতি চলছে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর একজন কূটনীতিক জানিয়েছেন যে, তেহরান এবং যুক্তরাষ্ট্র আরও আলোচনার ব্যাপারে একমত হয়েছে।
শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, ইরানের পক্ষ থেকে সেটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিশ্বজুড়ে গ্যাসোলিন, খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের আগে, তেহরান কিছু জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছিল যেগুলোকে তারা 'বন্ধুত্বপূর্ণ' হিসেবে গণ্য করত (যাদের পতাকা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মিত্র কোনো দেশের নয়)। তবে এর বদলে তারা মোটা অংকের ফি আদায় করত, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার শামিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
কিছু বিশ্লেষক সন্দেহ পোষণ করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল শক্তির জোরে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করতে পারবে কি না। এই অবরোধ কীভাবে কার্যকর হবে বা ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত এই কৌশলগত জলপথটি খুলে দিতে স্থলবাহিনী নামানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে মার্কিন বাহিনীর জন্য ঝুঁকি কতটা বাড়বে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ইরান এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের সব বন্দরে হামলার হুমকি দিয়েছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার 'ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিং' জানিয়েছে, "পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের নিরাপত্তা হয় সবার জন্য হবে, নয়তো কারোর জন্য নয়।" ইরানি সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "এই অঞ্চলের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।"
ওয়াশিংটনের অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা হুমকির ফলে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে চলমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সোমবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবারও দাবি করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের নৌবাহিনীকে "একদম ধ্বংস" করে দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৫৮টি জাহাজ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে এবং সেগুলো এখন "সমুদ্রের তলদেশে পড়ে আছে"।
তিনি আরও বলেন, "আমরা শুধু তাদের অল্প কিছু দ্রুতগামী আক্রমণকারী জাহাজ (ফাস্ট অ্যাটাক শিপ) লক্ষ্য করিনি, কারণ সেগুলোকে আমরা বড় কোনো হুমকি মনে করিনি। তবে সতর্ক করে দিচ্ছি: এই জাহাজগুলোর কোনোটি যদি আমাদের অবরোধের কাছাকাছি আসে, তবে সেগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে নির্মূল করা হবে। সমুদ্রে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আমরা যে ব্যবস্থা নিই, এদের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই করা হবে।"
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালী খুলে দিয়ে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ করা, কারণ তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জাহাজ চলাচল সীমিত থাকা এবং নতুন করে মার্কিন অবরোধের ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ৮ এপ্রিলে ৯১ ডলার ছিল।