ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যকার সম্পদের ব্যবধান আরও বাড়ছে

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৪:১৬, ১১ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১৪:২৩, ১১ এপ্রিল ২০২৬

ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যকার সম্পদের ব্যবধান আরও বাড়ছে

প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।

জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যকার ব্যবধান আরও প্রকট হচ্ছে। গত বছর বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনেক দেশ একমত হলেও, সেই প্রতিশ্রুতিগুলো এখনও বাস্তবায়ন না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং দেশগুলোর মধ্যকার বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে গত জুনে স্পেনের সেভিলে একটি রূপরেখা গৃহীত হয়েছিল। আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক বসবে, খবর জাপান টুডে’র। 

আইএমএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, তারা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ইতিবাচক করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু ইরান যুদ্ধ এখন বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল লি জুনহুয়া বলেন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণের পথ আরও কঠিন করে তুলছে। তার মতে, এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সময়, কারণ এখন অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আর্থিক নীতিগুলো ক্রমেই রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্ধারিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বাধা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঘনঘন আঘাতকেও এই বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গত বছরের সেভিল সম্মেলনে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের নেতারা (যুক্তরাষ্ট্র বাদে) সর্বসম্মতিক্রমে ‘সেভিল কমিটমেন্ট’ গ্রহণ করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল উন্নয়নের জন্য বার্ষিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি পূরণ করা। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-সহ আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছিল।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বারবার এই দুই প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তার মতে, আইএমএফ দরিদ্র দেশগুলোর বদলে ধনী দেশগুলোকে বেশি সুবিধা দিয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক তার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে—বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে, যার ফলে বহু দেশ ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। সমালোচকরাও একই সুরে বলছেন যে, এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের একাধিপত্যের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

সেভিল কমিটমেন্ট বাস্তবায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদনটি বলছে, বর্তমানের এই বিশাল আর্থিক ব্যবধান কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই প্রতিশ্রুতিগুলোই এখন ‘সেরা আশা’ হিসেবে টিকে আছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কেবল অনিচ্ছার ফল নয়, বরং এটি পরিকল্পিত নীতি এবং আর্থিক সংকোচনের একটি অশুভ ফলাফল। আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল বিষয়গুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
উন্নয়ন সহায়তায় ঐতিহাসিক পতন

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তায় (Official Development Assistance) যে ধস নেমেছে, তা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
২৫টি দেশ তাদের সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে।
২০২৪ সালের তুলনায় সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন সহায়তা ২৩% হ্রাস পেয়েছে, যা এ যাবতকালের রেকর্ড পতন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, যারা তাদের সহায়তার হার ৫৯% কমিয়ে দিয়েছে।
২০২৬ সালের জন্য যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তাতে আরও ৫.৮% পতন আশা করা হচ্ছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত।

বাণিজ্যিক বাধা ও শুল্কের প্রভাব

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক শুল্ক নীতি দরিদ্র দেশগুলোর কোমর ভেঙে দিচ্ছে:
ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্কসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি বাজারকে সংকুচিত করেছে।
বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর রপ্তানির ওপর গড় শুল্ক ২০২৫ সালে ৯% থেকে লাফিয়ে ২৮% এ দাঁড়িয়েছে।
চীন বাদে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে গড় শুল্ক ২% থেকে বেড়ে ১৯% হয়েছে।

আর্থিক ব্যবধান ও ভবিষ্যৎ

সেভিল কমিটমেন্ট (Seville Commitment) যেখানে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বার্ষিক অর্থায়ন ঘাটতি পূরণের কথা বলেছিল, সেখানে এই বিশাল শুল্ক বৃদ্ধি এবং সহায়তার পতন সেই লক্ষ্যকে আরও ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন দ্বিমুখী সংকটে রয়েছে: একদিকে ঋণের বোঝা এবং অন্যদিকে রপ্তানি আয়ে ধস।

জাতিসংঘের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি মানবিক সংকট তৈরি করছে যা ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন