ঢাকা, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০ ভাদ্র ১৪৩৩, ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

ক্যামেরুনে

সংস্কার লড়াইয়ের শুরুতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কঠিন পরীক্ষার মুখে

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৬:১১, ২৬ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৬:১৩, ২৬ মার্চ ২০২৬

সংস্কার লড়াইয়ের শুরুতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কঠিন পরীক্ষার মুখে

প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।

ক্যামেরুনের রাজধানীতে এই সপ্তাহে ১৬৬টি দেশের বাণিজ্য মন্ত্রীরা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। সংস্কার, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং উন্নয়ন নিয়ে সদস্যদের মধ্যকার বিভেদ এই সংস্থাকে বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

ইয়াউন্দেতে বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার পর্যন্ত ডব্লিউটিও-র ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা সংস্থাটির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরাম। ২০১৫ সালে নাইরোবির পর এটি দ্বিতীয়বার আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত কোনো সম্মেলন, খবর রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনালের। 

বিশ্ব অর্থনীতির এক উত্তাল সময়ে এই আলোচনা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি এবং বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণবাদী নীতির পুনরুত্থান সেই বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলেছে, যা এখনও বিশ্বের প্রায় ৭২ শতাংশ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে।

সংস্থার মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা মন্ত্রীদের সুনির্দিষ্ট ফলাফল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ডব্লিউটিও দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ আলোচনা এবং সংস্কারের কথা বলে আসছে, কিন্তু প্রায়শই আমাদের প্রতিশ্রুতি ফলাফলের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে।” তিনি সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে “এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হয়”।

ইয়াউন্দে সম্মেলনের মূল মনোযোগ তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের চেয়ে বরং সংস্কারের একটি রূপরেখা তৈরির ওপর থাকবে, যা সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাবকে প্রতিফলিত করে। সম্মেলনের আগে জেনেভায় নরওয়ের রাষ্ট্রদূত পেটার ওলবার্গ বলেন, “অধিকাংশ সদস্যই এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন... তবে কিছু দ্বিমতও রয়েছে।”

চাপের মুখে সংস্কার

খসড়া সংস্কার পরিকল্পনাটি মূলত ডব্লিউটিও-র সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, সংস্থাটির নিয়মের অধীনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে আচরণ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বাজারের অস্থিতিশীলতা দূর করার ওপর আলোকপাত করছে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার জন্য সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে, কারণ এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নিতে হয়। বেশ কয়েকজন সদস্য এখন আরও নমনীয় পদ্ধতির দাবি জানাচ্ছেন, যার মধ্যে আগ্রহী দেশগুলোর ছোট ছোট গ্রুপের মধ্যে চুক্তির বিষয়টিও রয়েছে।

এর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও একটি বড় ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে।
উন্নত অর্থনীতিগুলোর কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন যে, বড় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর এখন আর দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর মতো একই ধরনের নমনীয়তা বা বিশেষ সুবিধা পাওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে, অনেক উন্নয়নশীল দেশ মনে করে যে এই সুবিধাগুলো তাদের জন্য এখনও অপরিহার্য।

বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনার সভাপতি কাদরা হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে বলেছেন, “উন্নয়ন একটি বহুমুখী বিষয় এবং এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) কার্যক্রমের কেন্দ্রে থাকা উচিত।”

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়ায় ডব্লিউটিও-র বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও বর্তমানে অচল হয়ে আছে। ২০২০ সালে একটি সাময়িক ব্যবস্থা চালু করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

ডিজিটাল বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনা

ইয়াউন্দে সম্মেলনের আরেকটি বড় ইস্যু হলো ডিজিটাল বাণিজ্য। সফটওয়্যার, চলচ্চিত্র এবং ডেটা বা তথ্যের আন্তঃসীমান্ত আদান-প্রদানের ওপর কর আরোপ না করার দীর্ঘদিনের নিয়মটি বহাল রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে সদস্যদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কিছু উন্নয়নশীল দেশ যুক্তি দিচ্ছে যে, এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তারা কর রাজস্ব আদায় করতে পারবে। তবে অন্যরা সতর্ক করে দিয়ে বলছে যে, এটি তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (UNCTAD) ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কর থেকে প্রত্যাশিত লাভ সম্ভবত সীমিত হবে এবং এটি অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ই-কমার্স বিষয়ক ডব্লিউটিও সমন্বয়ক রিচার্ড ব্রাউন বলেন, “ডিজিটাল বাণিজ্য অবিশ্বাস্য গতিতে বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন রূপ দিচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সরকারগুলোকে তাদের নীতি ও অবকাঠামো খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

মৎস্য ও কৃষি খাতের বিভাজন

মৎস্য খাতের ভর্তুকি এবং কৃষি—এই দুটি বিষয়েও মন্ত্রীদের আলোচনার কথা রয়েছে, যেখানে সদস্যদের মধ্যে তীব্র মতভেদ বিদ্যমান।

মৎস্য ভর্তুকি বিষয়ক একটি ২০২২ সালের চুক্তি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কার্যকর হয়েছে। তবে অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং অতিরিক্ত মাছ ধরা বন্ধে একটি পরবর্তী চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এখানেও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কতটা নমনীয়তা দেওয়া হবে, তা নিয়ে সদস্যরা বিভক্ত।

কৃষি খাতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি খসড়া সমঝোতা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। এটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত হলেও আফ্রিকার তুলা উৎপাদনকারী দেশসহ কিছু সদস্য দেশ বলছে যে, এতে তাদের অগ্রাধিকারগুলো পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন