শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:৪৯, ১৩ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৩, ১৩ মার্চ ২০২৬
মানচিত্র: সংগৃহীত।
গত বৃহস্পতিবার নতুন আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দেওয়া বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে জেনেভায় নিযুক্ত ইরানের জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ইউরোনিউজকে বলেছেন যে, ইরান হরমুজ প্রণালী অবরোধ বা সেখানে মাইন পুঁতে রাখার কোনো পরিকল্পনা করছে না।
রাষ্ট্রদূত আলী বাহরাইনি বলেন, “হরমুজ প্রণালী অবরোধ করার কোনো উদ্দেশ্য ইরানের নেই। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার কারণ এই অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। সেখানে গোলাগুলি চলছে,” খবর ইউরো নিউজের।
ইউরোনিউজ যখন রাষ্ট্রদূতের এই সাক্ষাৎকার নিচ্ছিল, তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই তেহরান নতুন আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির প্রথম বিবৃতি প্রকাশ করে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পঠিত সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখবে।
ইরান যুদ্ধের শুরুতে সাবেক আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যালোচনার মধ্যে এই মন্তব্যগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তার বাবার ওপর হওয়া প্রাথমিক হামলায় মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন বলে খবর ছড়ানোর পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কিছু অসমর্থিত দাবি অনুযায়ী তিনি সামান্য আহত হয়েছেন, আবার কারো মতে তিনি গুরুতরভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।
গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী ইরান যখন জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে মাইন বসানোর মাধ্যমে সংঘাত বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, ঠিক তখনই বিভ্রান্তি বাড়িয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত দাবি করলেন, তেহরান এখনো বিশ্বাস করে "হরমুজ প্রণালী একটি শান্তির প্রণালী।"
"আমরা একে নিরাপদ করার চেষ্টা করছি"
রাষ্ট্রদূত বাহরাইনি উল্লেখ করেন যে, ইরান এই করিডোরটিকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে। তিনি আরও যোগ করেন, "যতক্ষণ কোনো হুমকি নেই এবং এই অঞ্চলে কোনো যুদ্ধ নেই, ততক্ষণ এই পথটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত এবং সবাই এটি ব্যবহার করতে পারে।"
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, "আমাদের কর্মকর্তারা ঘোষণা করেছেন যে—আমরা কেবল সেইসব দেশের জাহাজের ওপর সীমাবদ্ধতা বা বিধিনিষেধ আরোপ করব, যারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কোনো না কোনোভাবে জড়িত।"
পণ্যবাহী জাহাজে হামলা অব্যাহত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তেহরান প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালীতে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যার উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষতি করা এবং বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করা।
গত বুধবার ইরাক উপকূলে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার—একটি মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এবং অন্যটি গ্রীক মালিকানাধীন ও মাল্টার পতাকাবাহী—হামলার শিকার হয়েছে। এই হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন এবং তেলের দাম সাময়িকভাবে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে, যা তেহরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাবে ইরান খুশি নয় বলে স্বীকার করলেও বাহরাইনি জানান, তেহরান তাদের লড়াই থামাবে না। তিনি বলেন, “এটি ইরানের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে, আমরা তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু ইরান অর্থনৈতিক ও সামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই একটি সহনশীল দেশ।”
যতদিন প্রয়োজন ইরান লড়াই করতে প্রস্তুত
জেনেভায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত বৃহস্পতিবার ইউরোনিউজকে বলেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। বাহরাইনি বলেন, "যতদিন প্রয়োজন ইরান নিজেকে রক্ষা করতে প্রস্তুত।"
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছিলেন যে, তেহরানের কাছে "আমাদের পূর্ব ও পশ্চিমে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরাজয়গুলো নিয়ে গবেষণা করার জন্য দুই দশক সময় ছিল" এবং তারা সেই অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করেছে। সেই সুর মিলিয়ে বাহরাইনি বলেন, ইরান "এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা যখন আলোচনা করছিলাম, আমাদের সামরিক বাহিনীর মূল্যায়ন ছিল যে হুমকি আসন্ন। আমাদের দেশ যতদিন প্রয়োজন যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে, যতক্ষণ না আগ্রাসন বন্ধ হয় এবং আমাদের দেশের বিরুদ্ধে নতুন কোনো আগ্রাসনের সম্ভাবনা শেষ হয়।"
একই সময়ে ইরানি রাষ্ট্রদূত জোর দিয়ে বলেন যে, তেহরান আলোচনার জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কূটনীতি বর্জনের অভিযোগ তোলেন। যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ওয়াশিংটন জয়ী হতে পারছে না বলে দাবি করেন বাহরাইনি।
তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের ভুল হিসাব (miscalculation) করেছে। তারা যা করতে চেয়েছিল তার সবটাই ব্যর্থ হয়েছে, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল যে তারা কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানকে পরাজিত করতে পারবে।"
তবে বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় দুই সপ্তাহের মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধকে "খুবই পূর্ণাঙ্গ" (very complete) বলে বর্ণনা করেছেন।