শিরোনাম
মোঃ মোজাম্মেল হক
প্রকাশ: ১২:২৩, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৯:৪২, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
ভারতে উদ্বাস্তু শিবিরের মানুষজন খাবারের জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন (১৯৭১)। ছবি: সংগৃহীত।
সেদিন ছিল ১৯৭১ সালের মার্চ এর প্রথম সপ্তাহ। আমি তখন ছয় ক্লাস পেরিয়েছি। আমার কিশোর মনে নানা কৌতুহল, কখনও ভয় কখনও যুদ্ধ বিষয়ে জানার আগ্রহ কাজ করছিল।
বড়দের দেখে বুঝতে পারছিলাম, চারদিকে আতঙ্কের ঘনঘটা ! সবার মনে কি হবে... কি হবে এক উত্তরহীন প্রশ্ন সর্বদাই উঁকি মারছে! স্বাধীনতা আসবে তো? আমি আমার চৌহদ্দির মধ্যে ঘুরে ঘুরে এই বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করছি।
বাবা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন এবং স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছেন। সে সময় আমাদের পরিবার বিরামপুরে একটি ব্যবসায়ী (ধান-চাল) পরিবার ছিল। পরিবার বড় ছিল, বিধায় বাবা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। ফলে, আমাদের নিয়ে বাবা ভারতে আশ্রয় নিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে ছিলাম বলেই আমাদের বাড়িটি পাক-হানাদারদের টার্গেট ছিল। তারা আমাদের বাড়িটি পুড়িয়ে দিল।
ভারতে যাবার পর নানা করুণ কাহিনী দেখতে হযেছে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতে যাবার পথে বাবা গরুর গাড়ীতে ১২বস্তা চাউল নিজ গোডাউন থেকে নেন। পথে দেখলাম, হাজার হাজার নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে পায়ে হেঁটে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সীমান্তের ওপারে যাচ্ছে । এখানে না বললেই নয়, পথিমধ্যেই ১০ বস্তা চাউল কে বা কাহারা নিয়ে গেল। বাবাও দিয়ে দিলেন। আমাদের বললেন ওদেরও তো খেতে হবে। বাকি ২ বস্তা চাউল, কিছু কাপড় চোপড়সহ গোটগাছ গ্রামে আমার নানার বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। দু’দিন পর আবারও রওনা দিলাম নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। প্রথমেই পরিবারের সদস্য সহ পায়ে হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের কুমার গ্রামে উপস্থিত হলাম। মাইলের পর মাইল হেঁটে প্রায় সবার পা ফুলে এক কঠিন অবস্থা! কী আর করা। মাস কয়েক কুমার গ্রামে থেকে আমরা আবারও যাত্রা শুরু করলাম আরও ভেতরে ঠাকুরপুরা পেরিয়ে ত্রিমোহনীতে । হিলি-বালুরঘাট রাস্তার পাশে এক কাকা বাবুর বাসা ভাড়া নিয়ে বাবা শুরু করলেন জীবনের আরেক অধ্যায়। শুরু করলেন ধানের ব্যবসা। কবে শেষ হবে যুদ্ধ, কবে স্বাধীন দেশ পাবো, সেই চিন্তায় সবাই নিমগ্ন।
বাবা ত্রিমোহনীতে ধান কিনে ইসলাম পুরে পাঠাতেন ট্রাক ভরে। মাঝে মাঝে আমি, দুলাভাই ও বড় ভাই সবাই সাথে ট্রাকে করে ইসলামপুরে যেতাম। ইতোমধ্যে যুদ্ধের ঘনঘটা তীব্রতর হয়েছে। এদিকে, এলাকার অনেকের সাথেই দেখা সাক্ষাৎ হওযা শুরু হলো । একেক জনের একেক সমস্যা! বাপ-চাচাসহ অনেকেই স্বাধীনতার পক্ষে স্বক্রিয় ছিলেন। বাবা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। এখানে বলা প্রয়োজন, ত্রিমোহিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব প্রয়াত বিমল বাবু, শ্যাম সুন্দর গোস্বামী, তৈলাক্ত কবিরাজ প্রমুখ এদেশ থেকে পাড়ি দেয়া শরণার্থীদের তাদের উদাত্ত সেবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এবিষয়টি কোন দিনই ভুলবার নয়। ভারতীয় বাহিনীর কর্মকর্তারা আমার বাবা বাবা নিয়ামত আলী মন্ডল, মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ চাচা, মফিজ ম্যানেজার চাচা, নটু শেখ চাচা, রিয়াজ চাচা, আতাউর চাচা, এ্যাডভোকেট মাওলা বক্শ, এ কে এম শাহজাহান ও গোলজার নানাসহ অনেককেই ডেকে নিয়ে প্রায় সময় তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন। এপার বাংলার বিভিন্ন তথ্য নিতেন যা খান-সেনাদের অবস্থানের স্থানগুলো চিহ্নিত করার জন্য ও যদ্ধের কৌশলের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। এভাবে দিন যায়, মাস যায়--লোকজন আজ ওখানে... তো কাল সেখানে। গোলাগুলি চলছে। রেডিওতে এলান আসে ওমুক জায়গায় এত জন খান সেনা নিহত-আহত, এত জন ধরা পড়ল ইত্যাদি।
ভারত যাবার আগের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। বিরামপুরে ডাঃ কাসেম চাচা এলাকার যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শুরু করেছেন, পাক সেনাদের প্রতিহত করার জন্য। আমাদের বিরামপুরের উপকণ্ঠ দিযে বয়ে গেছে ‘ছোট যমুনা ’ নদী । কাসেম চাচা নদীর পাড়ে সেই ট্রেনিং চালাচ্ছেন। যদিও আমরা কজন ছোট, তার মধ্যে আমিসহ হাবিব, বাবু, রতন, স্বপন প্রমুখ বন্ধুরা তাঁদের পিছনে দৌড়াতে শুরু করি । গরুহাটি থেকে নদীর পাড় দিয়ে শিমুলতলী মির্জাপুর যাবার পর সবাই হাফিয়ে পড়ি। ডাক্তার কাসেম চাচা বললেন, যা তো ঐ বাড়ী থেকে জগ ভর্তি পানি ও মগ নিয়ে আয়। আমরা তার আদরের নির্দেশনা পাওয়া মাত্র ছুটে যাই, সেই বাড়ীতে। জগ ভর্তি পানি ও মগ এনে সবার তৃষ্ণা নিবারণ করে অশেষ আনন্দ লাভ করেছিলাম। তাপর, আবারো জগ ও মগ সেই বাড়ীতে দিয়ে আসি। নিজের মধ্যে কিছুটা গর্ব অনুভব হচ্ছিল। অজানা এক আনন্দ! সাথে সাথে মনের মধ্যে একটা উদ্দীপনাও কাজ করল-- কিছু তো একটা করলাম স্বাধীনতার জন্য। এমন ছোট খাট অনেক ঘটনা আছে।
ভারতে যাবার আগ পর্যন্ত বাবা নিয়ামত আলী মন্ডল ও নটু শেখ চাচাও উদীয়মান যুবকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিকল্পনা দিতে থাকেন বর্তমান ধানহাটির তৎকালীন পাকুড় গাছতলায়। প্রশিক্ষণে আনোয়ার হোসেন মিঞা, আবুল হোসেন (লিবিয়া প্রবাসী), আবু জাহের, নুরুল হক, আব্দুল ওয়াজেদ, ইসরাইল (সাবেক সেনা), মঞ্জু (ঘাটপাড়), রতন, সিদ্দিক, হাফেজ, আলাউদ্দিন মোল্লা ভাইসহ অনেকেই অংশ গ্রহন করেন।
ভারতে থাকাকালীন সেখানেও আমরা মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীদের বেশ সহযোগিতা করেছি। নিজেদের মনে হয়েছিল আমরা ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধা! স্বাধীনতার জন্য আমরা যা করেছি সেটি আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য ছিল বলে মনে করি। এখানে উল্লেখ্য যে, আমরা যখন ত্রিমোহনীতে অবস্থান করছিলাম সে সময় ছিল রোজার মাস। ঈদের আগে বাবা সহ ক’জন মুরুব্বী অনেকটা পরিত্যক্ত একটি ঈদগাহ ময়দান তদারকি করতে গেলেন। তাঁর সাথে আমরা ক’জন ক্ষুদে তেজোদীপ্ত বালক ঈদগাহ প্রাঙ্গন পরিষ্কার শুরু করলাম । সেকি আনন্দ লেগেছিল মনে তা যেন ভাষায় প্রকাশ করা যায় না! আমাদের টিমে অন্যদের মধ্যে ছিলেন হাবিব, বাবু, রতন ও স্বপন প্রমুখ। দু’দিন পর ঈদ। অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আমাদের মধ্যে চরম আনন্দ বিরাজ করছিল। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু লোকজন ও সাধারণ শরণার্থীগণ বেশ সহযোগিতা করেছিলেন। এখানে বলতে হয়, আমাদের একটি রেডিও ছিল । যখন রেডিওতে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার কবির উদ্দিন ‘সংবাদ বুলেটিন’ দিতেন, আমরা তা অধীর আগ্রহ নিয়ে শুনতাম। তবে মনের মধ্যে একটা সংশয় কাজ করত, আরও কতদিন লাগবে দেশ স্বাধীন হতে!
এখানে অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন, তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দ্রিরা গান্ধীর বেশ বড় ভুমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শুরু হলো ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। ট্রেনিং এ অনেকেই অংশ গ্রহন করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যারা সম্মুখ যুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, সেসব মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ভাবে যারা সহযোগিতা করেছিলেন তারাও সহযোদ্ধা।
মা আমাদের আদরের চাদরে আগলিয়ে রাখতেন। তবুও মায়ের মনের মধ্যে একটা দুঃচিন্তা কখন দেশ স্বাধীন হবে আর আমরা সবাই স্বাধীন দেশে ফিরে যাব। একদিন বলেই ফেললেন, অনেকের মত তোরাও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়, দেশ স্বাধীন কর। এভাবে আর থাকা যায় না। দেশ স্বাধীন হবেই। দোয়া করি বীর যোদ্ধাদের জন্য। ওপার বাংলার মানুষেরা এপার বাংলার মানুষদের এমন দশা দেখে তারাও আমাদের বিপদে এগিয়ে আসেন। বলতেন, চিন্তা করোনা তোমাদের দেশ একদিন স্বাধীন হবেই। তোমরা তোমাদের স্বাধীন দেশে চলে যাবে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি খুব ভাল ছিল। বলা বাহুল্য, বিরামপুরের কাকা বাবু অধীর কুমার দত্ত, বন্ধু শিবু ও তাদের পরিবারের সদস্য নিরাপদে ভারতে যাবার জন্য সহযোগিতা করা হয়। ভারতের ত্রিমোহীতে অবস্থান কালে এক সময়ে মহামারি আকারে চর্ম রোগ শুরু হয়। ভারতীয় সরকার মেডিকেল টিম পাঠিয়ে তা নির্মুল করেন।
দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ শেষে খান সেনাদের পরাস্ত করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা একটা লাল সবুজের পতাকা সহ সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ পেলাম। আমরা দেশ স্বাধীনের দুদিন পরে অর্থাৎ ১৮ই ডিসিম্বরে ভারত থেকে স্বাধীন দেশের নিজ বাসভূমি বিরামপুরে ফেরৎ আসি। এসে দেখি নিজ বাসস্থান সহ চারিদিকে শুধুই ধ্বংসস্তুপ! সেকি করুন হৃদয় বিদারক দৃশ্য যা এখনো মনের পাতায় ভাসে!
৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নেপাল, ভারত সহ অনেক দেশ আমাদের সদ্য স্বাধীন দেশকে স্বীকৃতি দিতে থাকে। যদিও চারিদিকে ধ্বংসস্তুপ তবু আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল যে, আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। আমরা বন্ধুরা কয়েকদিন ধরে স্বাধীন বাংলার বিজয়ের পতাকা নিয়ে মনের আনন্দে এদিক ওদিক দৌড়া-দৌড়ি করি। আহ! কী আনন্দ! কী উল্লাস!
(লেখক: সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, কৃষি উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক)