শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৮:৩৪, ১৬ মার্চ ২০২৬
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: সংগৃহীত।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান উত্তেজনার মাঝে ইরান কোনো 'যুদ্ধবিরতি'র (Ceasefire) আবেদন করছে না। একইসঙ্গে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বা কূটনীতির কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না।
টাইম ম্যাগাজিনের "Iran's Foreign Minister Denies Seeking Ceasefire, Sees ‘No Reason’ to Talk to the U.S." শীর্ষক প্রতিবেদনটি (১৫ মার্চ) মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইরানের কঠোর অবস্থানের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
আলোচনার প্রেক্ষাপট ও অনড় অবস্থান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ইরান এই মুহূর্তে কোনো যুদ্ধবিরতির (Ceasefire) জন্য মরিয়া নয়। সাধারণত সংঘাতের সময় দেশগুলো কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু আরাগচি উল্টো পথে হাঁটছেন। তার মতে, ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং লেবানন ও গাজায় চলমান হত্যাযজ্ঞের বিপরীতে ইরান এখন নতি স্বীকার করার পরিবর্তে পাল্টা প্রতিরোধের নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান আলোচনার জন্য কোনো ভিক্ষা করছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার অসারতা
প্রতিবেদনটির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের বর্তমান সম্পর্কের শীতলতা। আরাগচি উল্লেখ করেছেন যে, এই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের সাথে কথা বলার "কোনো যৌক্তিক কারণ" তিনি দেখছেন না। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো আস্থার সংকট। ইরানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে শান্তির কথা বলে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে সংঘাতকে উসকে দেয়। আরাগচি দাবি করেন, আগের অভিজ্ঞতা থেকে ইরান শিখেছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তাই এই মুহূর্তে কোনো নতুন আলোচনার টেবিল তাদের কাছে অর্থহীন।
ইসরায়েল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা
আরাগচির বক্তব্যে ইসরায়েলের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি ফুটে উঠেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইসরায়েল যদি ইরানের ওপর কোনো ধরনের সরাসরি আক্রমণ চালায়, তবে ইরান তার যথাযথ এবং কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত। তিনি লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং গাজায় হামাসের ওপর ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ইরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের (Axis of Resistance) ছেড়ে যাবে না। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে হলে ইসরায়েলকে আগে আক্রমণ বন্ধ করতে হবে, ইরানকে চাপ দিয়ে লাভ হবে না।
পরমাণু ইস্যু ও সার্বভৌমত্ব
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের বিষয়ে আরাগচি তার দেশের সার্বভৌমত্বের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি জানান, ইরান পরমাণু বোমা বানাতে চায় না—এটি তাদের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নীতি। তবে পশ্চিমা দেশগুলো যদি নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক হুমকি দিয়ে ইরানকে কোণঠাসা করতে চায়, তবে ইরানও তার কৌশল পরিবর্তন করতে পারে। তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন যে, সংস্থাটি মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত হয়।
প্রতিরোধ এবং পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি
আরাগচি এই সাক্ষাৎকারে যুদ্ধের ময়দানে ইরানের সক্ষমতার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইরান এখন আর কেবল ছায়া যুদ্ধের (Proxy War) ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রয়োজনে তারা সরাসরি ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে আঘাত হানতেও দ্বিধা করবে না (যেমনটি সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে)। তার ভাষায়, ইরান যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা করে না, কিন্তু যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে তারা পিছপা হবে না।
আব্বাস আরাগচির এই বক্তব্য মূলত একটি "কৌশলী বারুদ"। তিনি বিশ্ববাসীকে বার্তা দিতে চেয়েছেন যে:
ইরান এখন আর নমনীয় কূটনীতির পথে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তাদের কোনো আস্থা নেই।
আঞ্চলিক যুদ্ধে ইরান তার সক্ষমতা প্রদর্শনে প্রস্তুত।
টাইম ম্যাগাজিনের এই প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমনের বদলে ইরান এখন তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে আরও বেশি আক্রমণাত্মক বা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান বেছে নিয়েছে।