শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১:৪১, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৩০, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হত্যার দায়ে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে । ছবি: সংগৃহীত।
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যার দায়ে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে বুধবার সে দেশের একটি আদালত ঘোষণা করেছে।
২০২২ সালে একটি নির্বাচনী প্রচারণার সময় আবেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত বছর অক্টোবর মাসে ৪৫ বছর বয়সী ওই বন্দুকধারীর বিচার শুরু হয়েছিল। ইতিপূর্বে বিচারের সময় তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন, খবর সুইডেন হেরাল্ড পত্রিকার।
জাপানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অর্থ হলো একজন বন্দি প্যারোলে মুক্তি পেতে পারেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মানুষ কারাগারেই মারা যান।
শিনজো আবে ২০০৬-২০০৭ এবং ২০১২-২০২০ পর্যন্ত দুই মেয়াদে জাপানের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
জেমিনাই যোগ করেছে:
শিনজো আবেকে গুলি করার মূল কারণ ছিল হামলাকারী তেতসুয়া ইয়ামাগামির ব্যক্তিগত ক্ষোভ, যা একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিল।
ইউনিফিকেশন চার্চের প্রতি ক্ষোভ: ইয়ামাগামির দাবি অনুযায়ী, তার মা 'ইউনিফিকেশন চার্চ' (Unification Church) নামক একটি ধর্মীয় সংস্থাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছিলেন। এই কারণে তার পরিবার দেউলিয়া হয়ে যায় এবং তাদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
শিনজো আবের সাথে সংযোগের ধারণা: হামলাকারীর বিশ্বাস ছিল যে, শিনজো আবে এই ধর্মীয় সংগঠনটিকে জাপানে প্রচার ও প্রসারে সহায়তা করেছেন এবং সংগঠনটির সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। যদিও শিনজো আবে সরাসরি ওই চার্চের সদস্য ছিলেন না, তবে তিনি তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যা ইয়ামাগামিকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
প্রতিশোধ গ্রহণ: রাজনৈতিক আদর্শের কারণে নয়, বরং তার পরিবারের এই দুর্গতির জন্য দায়ী মনে করা সংগঠনটির ওপর প্রতিশোধ নিতেই সে শিনজো আবেকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। ইয়ামাগামির মতে, সরাসরি চার্চের নেতাদের ওপর হামলা করা কঠিন ছিল, তাই সে আবেকে জনসমক্ষে হত্যার পরিকল্পনা করে।
২০২২ সালের ৮ জুলাই নারা শহরে একটি নির্বাচনী সভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় তাকে পেছন থেকে হাতে তৈরি বন্দুক দিয়ে গুলি করা হয়।
জাপানের দীর্ঘতম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিনজো আবে দেশটির অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে গেছেন। যেমন:
১. অর্থনৈতিক অঙ্গনে অবদান: 'অ্যাবেনোমিকস' (Abenomics)
শিনজো আবের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর প্রবর্তিত অর্থনৈতিক নীতি 'অ্যাবেনোমিকস'। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও মুদ্রাসংকোচন (Deflation) থেকে জাপানের অর্থনীতিকে বের করে আনতে তিনি তিনটি কৌশলী পদক্ষেপ বা 'তিনটি তীর' (Three Arrows) নিক্ষেপ করেছিলেন:
আক্রমণাত্মক মুদ্রানীতি: জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ২% নির্ধারণ করা, যাতে মানুষ টাকা খরচ করতে উৎসাহিত হয়।
আর্থিক প্রণোদনা: সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো।
কাঠামোগত সংস্কার: শ্রমবাজারের আধুনিকায়ন, কর্পোরেট কর কমানো এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য 'উইমেনোমিকস' (Womenomics) নীতি গ্রহণ।
২. আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে অবদান
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিনি জাপানকে একটি 'প্যাসিভ' বা নিষ্ক্রিয় রাষ্ট্র থেকে একটি 'প্রো-অ্যাক্টিভ' বা সক্রিয় ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেন।
মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক (FOIP): বর্তমান ভূ-রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা 'Free and Open Indo-Pacific' এর মূল প্রবক্তা ছিলেন শিনজো আবে। সমুদ্রপথে বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
কোয়াড (QUAD) গঠন: চীনকে মোকাবিলা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারসাম্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সমন্বয়ে 'কোয়াড' গঠনে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন।
প্রতিরক্ষা নীতি সংস্কার: জাপানের শান্তিবাদী সংবিধানের ব্যাখ্যা পরিবর্তন করে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জাপানি সেনাদের বিদেশের মাটিতে মিত্রদের হয়ে যুদ্ধ করার অনুমতি দেন।
ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠতা: ভারতের সাথে জাপানের কৌশলগত সম্পর্ককে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, যা দক্ষিণ এশিয়ায় জাপানের প্রভাব বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
৩. বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন শিনজো আবে। তাঁর আমলে বাংলাদেশের সাথে জাপানের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়:
তিনি ২০১৪ সালে ঢাকা সফর করেন এবং 'বিগ-বি' (Big-B) বা বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট প্রকল্পের ঘোষণা দেন।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর, যমুনা নদীর ওপর রেল সেতু এবং ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে জাপানের বিশাল বিনিয়োগ মূলত তাঁরই রাজনৈতিক সদিচ্ছার ফল।
সারসংক্ষেপে, শিনজো আবে জাপানকে বিশ্বমঞ্চে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সাহসী অবস্থানে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অর্থনীতির চাকাকে সচল করার মাধ্যমে এক আধুনিক জাপানের রূপকার হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।