ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

২৮ ফাল্গুন ১৪৩২, ২২ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম

Scroll
নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে রাজনৈতিক দলের যৌথ প্রচেষ্টার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
Scroll
জানুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে
Scroll
বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত, আহত ৪
Scroll
ইউরোপ: সেরা সৃজনশীল শহরের খেতাব পেল স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুব্লিয়ানা
Scroll
হাসপাতালে ভর্তি হলেন মির্জা আব্বাস
Scroll
এই সংসদ বাংলাদেশের জনগণের সংসদ: প্রধানমন্ত্রী
Scroll
সংসদকে যুক্তি, তর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী
Scroll
গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে সংসদ সদস্যদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের
Scroll
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নির্বাচিত
Scroll
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
Scroll
ঢাকা-মালে রুটে মালদিভিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পুনরায় শুরু
Scroll
উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা বন্ধের দাবি নিরাপত্তা পরিষদের
Scroll
পত্রিকা: ’প্রথম অধিবেশনে উত্তাপ ছড়াবে জুলাই সনদ’
Scroll
সলিমপুর: চার দশকে পাহাড় কেটে হাজার কোটি টাকার প্লট বাণিজ্য
Scroll
ইরান যুদ্ধ থেকে যেভাবে লাভবান হতে চায় রাশিয়া
Scroll
বাংলাদেশ ব্যাংক-বিজিএমইএ বৈঠক: পোশাক খাতে প্রতি মাসের নগদ সহায়তা প্রতি মাসেই ছাড়ের প্রতিশ্রুতি
Scroll
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হতে ডেনমার্ক ও জার্মানির সমর্থন চায় ঢাকা
Scroll
আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করবে সরকার: পরিবেশ মন্ত্রী
Scroll
মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
Scroll
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুর

চার দশকে পাহাড় কেটে হাজার কোটি টাকার প্লট বাণিজ্য

দৈনিক আজাদীর সৌজন্যে

প্রকাশ: ০৯:৩৩, ১২ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ০৯:৩৩, ১২ মার্চ ২০২৬

চার দশকে পাহাড় কেটে হাজার কোটি টাকার প্লট বাণিজ্য

সীতাকুন্ডের সলিমপুর জঙ্গলের একাংশ। ছবি: সংগৃহীত।


চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে চার দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি ও প্লট বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার কোটিরও বেশি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি খাসজমি দখল করে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা দুটি বড় আবাসিক এলাকায় হাজার হাজার প্লট বিক্রির মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই অর্থের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করতে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নব্বইয়ের দশকে আলী আক্কাস নামে এক বন প্রহরীর হাত ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড় কাটা ও দখলদারিত্বের সূচনা হয়। তিনি পাহাড় দখল করে প্লট বিক্রি শুরু করেন। পরবর্তীতে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আলী আক্কাস নিহত হলে তার সহযোগীরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেকসহ কয়েকজন পৃথক গ্রুপ গড়ে তোলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসিন মিয়া এলাকাটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি বড় আবাসিক বসতি গড়ে উঠেছে। এর একটি নিয়ন্ত্রণ করে ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ এবং অন্যটি ‘আলীনগর সমবায় সমিতি’। ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ৩৩টি পাহাড় কেটে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০টি প্লট তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে আলীনগর এলাকায় তিনটি পাহাড় কেটে প্রায় আড়াই হাজার প্লট তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি প্লট ১০ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ভূমি অফিসের জরিপ অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অন্তত ৩৭টি পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। পাহাড় কাটার জন্য সেখানে টোকেন পদ্ধতিও চালু ছিল। প্রতিদিন নির্দিষ্ট অর্থ দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করলে পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়া হতো। স্থানীয়দের ভাষ্য, কম দামে শহরসংলগ্ন প্লটের মালিক হওয়ার সুযোগ দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে এই বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। শুরুতে ৫০ টাকার নন–জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে প্লট বিক্রি করা হলেও পরে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে দলিলসদৃশ কাগজে প্লট বিক্রির প্রথা চালু হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্লট ক্রেতাদের মধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষও রয়েছেন।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, পাহাড় কেটে প্লট তৈরি ও বিক্রির পাশাপাশি মাটি বিক্রি, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ, শ্রমিক সরবরাহ এবং পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগের মতো নানা উপায়ে বড় অঙ্কের অর্থ আয় করা হতো। পাহাড়ের ভেতরে গভীর নলকূপ বসিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির সরবরাহ এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে পাহাড়ের প্রবেশপথে পাহারা বসানো হয়েছিল। এলাকায় নজরদারির জন্য পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও সিসিটিভি ক্যামেরাও বসানো হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকার ফেরারি আসামি, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলেও পরিণত হয়েছিল এলাকাটি।

গত কয়েক বছরে সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেও পৃথক ঘটনায় আরও দুজন নিহত হন বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

ইয়াছিনের একক আধিপত্যের মাঝে বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উত্থান ঘটে রোকন মেম্বারের। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ইয়াছিন বাহিনীর সাথে থাকা রোকন মেম্বার ৫ আগস্টের পরে গঠন করে নিজের বাহিনী। প্লট বাণিজ্য, মাটি বিক্রি, পাহাড় কাটা, মাদক পাচার এবং হাজার হাজার পরিবার থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় নিয়ে ইয়াছিন বাহিনী এবং রোকন বাহিনীর বিরোধ তুঙ্গে উঠে।

থানা সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ইয়াসিন মিয়ার বিরুদ্ধে ২১টি, রোকন মেম্বারের বিরুদ্ধে ২৮টি, কাজী মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে ২৭টি, নুরুল হক ভান্ডারীর বিরুদ্ধে ১৭টি এবং সাদেক ও গফুরের বিরুদ্ধে ৯টি করে মামলা রয়েছে। এসব মামলা সীতাকুণ্ড, আকবরশাহ ও বায়েজিদ থানাসহ বিভিন্ন থানায় দায়ের করা হয়েছে। এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান চালালেও তীব্র বাধার মুখে অভিযান আংশিকভাবে স্থগিত করতে হয়। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এলাকাটির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, সামপ্রতিক অভিযানের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, যা একটি বড় সাফল্য। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু ভূমিদস্যু সরকারি খাসজমি দখল করে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তুলেছিল। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এর পেছনে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হবে।

র‌্যাব–৭–এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত অভিযান কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা হবে। প্রথম ধাপে বাহিনী এলাকায় প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। পরবর্তী ধাপে অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং স্থায়ীভাবে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর নামে পরিচিত হলেও এলাকায় এখন আর আগের মতো বনভূমি নেই। অধিকাংশ পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি ও বসতি। স্থানীয়দের মতে, বহু বছর ধরে পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে ওঠা এই বিশাল বসতি এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন