শিরোনাম
কালাম আজাদ, বাসস
প্রকাশ: ১৬:২৯, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
এম এ হাসানের ক্ষেত। ৭ বিঘা জমিতে চাষ করছেন স্ট্রবেরি ফল। বাসস।
ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কয়েকবার বিদেশ গিয়েও ফেরত আসতে হয়েছিল বগুড়া সদরের যুবক এম এ হাসানকে। এক পর্যায়ে দেশের মাটিতে নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেন বিভিন্ন ফলের আবাদ। কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও লোকসানের পর ভাগ্যের চাকা ঘোরায় বিদেশি সুস্বাদু ফল স্ট্রবেরি। এখন হাসানের ধ্যান-জ্ঞান সব স্ট্রবেরিকে নিয়ে।
এম এ হাসান সদর উপজেলার লাহিরীপাড়া ইউনিয়নের রায় মাঝিড়া গ্রামের বাসিন্দা। এই গ্রামেই ১৬ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন নিজের শালিন এগ্রো ফার্ম। এর মধ্যে শুধু ৭ বিঘা জমিতে চাষ করছেন স্ট্রবেরি ফল।
তরুণ এই উদ্যোক্তার কাছে জানা যায়, সময়টা ছিল ২০১৪ সাল। কয়েক দফা বিদেশ থেকে ফেরত এসে অনেকটা দিশেহারা ছিলেন হাসান। তবে আশাহত না হয়ে নিজ গ্রামের বাড়ি রায়মাঝিড়ায় ২ বিঘা জমিতে পেঁপে, স্ট্রবেরিসহ মিশ্র ফলের চাষ শুরু করেন। পরের ৪ বছর কোনো লাভের মুখ দেখতে পারেননি। এই সময়টা হাসান স্ট্রবেরি থেকে চারা উৎপাদন করেন। নতুন নতুন জাত তার বাগানে আবাদ করতে থাকেন। এরপর অবশ্য তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অন্য ফলের চাষ ছেড়ে পুরোদস্তুর স্ট্রবেরি চাষে মন দেন।
৭ বিঘা জমির বাগানে হাসান কয়েকটি জাতের স্ট্রবেরি চাষ করছেন। এগুলোর মধ্যে উইন্টার ডন, মন্টিয়ার, আমেরিকান ফেস্টিভাল, এফ-২১ জাতগুলোর ফলন বেশি ভালো বলে জানালেন তিনি। বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ফলন মেলে এই স্ট্রবেরির। এ ছাড়া সারা বছর নিজের বাগানের চারা বিক্রি করেন।
হাসান জানান, মূলত সারাবছর চারা বিক্রি করি। এখন চারা বিক্রির মূল মৌসুম। পাশাপাশি ফল উৎপাদনের জন্য নতুন করে গাছ লাগানোর প্রস্তুতি চলছে। এসব গাছে জানুয়ারি মাস থেকে ফলন আসা শুরু করবে। প্রায় এপ্রিল মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
হাসানের শালিন এগ্রো ফার্মে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাগান জুড়ে কৃষি শ্রমিকদের ব্যস্ততা। কেউ বিক্রির জন্য স্ট্রবেরির চারা তুলছেন। আরেক জায়গায় নতুন করে চারা রোপনের প্রস্তুতি চলছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চারা রোপনের উপযুক্ত সময়। এই সময় বেশি চারা বিক্রি হয়। প্রতি চারা জাত ভেদে ১০-৪০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করেন তরুণ এ কৃষক। তবে মৌসুম বাদে এসব চারার দাম থাকে আরও বেশি।
হাসানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের প্রায় সব জেলা থেকে কৃষি উদ্যোক্তারা আসেন চারা কিনতে। চারা বিক্রির পাশাপাশি আবাদ নিয়ে নানা রকম পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বেশিরভাগ ক্রেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে আগ্রহী হয়ে এখানে আসেন। এমনি দুই তরুণ উদ্যোক্তা এসেছেন বগুড়ার ধুনট উপজেলা থেকে।
ধুনট উপজেলার নিমগাছী গ্রামের বাসিন্দা সৈকত ইসলাম ৪৫০ পিস স্ট্রবেরির চারা ক্রয় করেছেন। জানালেন, ইউটিউবে হাসানের স্ট্রবেরির ভিডিও দেখে প্রথম খোঁজ পান তিনি। এর আগেও একবার চারা কিনেছেন এখান থেকে। ভালো ফল পাওয়ায় এবার আরও কিছু চারা কিনতে এসেছেন।
একই এলাকার ইমরানও জানালেন, এর আগে ৫ শতক জমিতে স্ট্রবেরি থেকে আয় করেছেন প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। তাই আবারও হাসানের ফার্মে এসেছেন চারা ক্রয় করতে।
দীর্ঘ এক যুগে শালিন এগ্রো ফার্ম নামে এই স্ট্রবেরির বাগানের শুধু কলেবর বাড়েনি। অর্থনীতির চাকার গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি এখানে কর্মসংস্থানের যোগানও হয়েছে। স্থানীয় ১৬ জন কৃষক ও তরুণদের নিয়ে নিজের বাগানে কাজ করেন হাসান। প্রতিটি শ্রমিক কাজ করেন দিন ৬০০ টাকা মজুরিতে।
রায়মাঝিড়া গ্রামের মো. জিহাদ হোসেন বলেন, হাসান ভাই আমার চাচাতো ভাই হয়। ৬ থেকে ৭ বছর ধরে তার ফার্মে কাজ করছি। এতে আমার হাত খরচের টাকা উঠে আসে। আর মাঠে স্ট্রবেরি নিয়ে কাজ করতে নিজেরও ভালো লাগে। এখানে স্ট্রবেরি লাগানো থেকে শুরু করে চারা উৎপাদন, সব ধরনের কাজ করে থাকি।
মো. সাকিম নামে আরেক কৃষি শ্রমিক জানান, সকাল ৭টা থেকে আমরা কাজ শুরু করি। বিকেল পর্যন্ত কাজ চলে। গাছগুলোয় যখন স্ট্রবেরি ধরে, তখন দেখতে বেশি ভালো লাগে। আমরা নিজেরাও খাই। খুব সুস্বাদু।
মৌসুমে প্রতি গাছে ১ থেকে দেড় কেজি ফল পাওয়া যায়। প্রতি কেজি ফল জাত ভেদে ৩০০-১০০০ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানালেন কৃষি উদ্যোক্তা হাসান। এগুলো বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেন তিনি।
হাসান বলেন, ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২ বিঘা জমিতে শুরু করেছিলাম। এখন এই স্ট্রবেরির বাগানের পরিমাণ ৭ বিঘা। বছরে অন্তত অর্ধকোটি টাকার চারা ও ফল বিক্রি হয় এই বাগান থেকে। অফ সিজনে চারা বিক্রি কম হয়। কিন্তু তখন দাম বেশি থাকে। সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় প্রতি চারা বিক্রি হয়েছে।
হাসানের সফলতার পেছনে নিজের পরিশ্রম ও ধৈর্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল পরিবারের উৎসাহ-সহযোগিতা। বাবা-মা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তিনি জানান, ব্যবসা বা কৃষিতে সময় দিলে টাকা আসবেই। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য।
এগুলোর পাশাপাশি পরিবারের সহযোগিতা লাগবে। আমার পরিবারে সদস্যদের উৎসাহ ও সহযোগিতা না থাকলে আমি এই অবস্থানে আসতে পারতাম না।
হাসান আরও বলেন, আমার এখানে অনেক উদ্যোক্তা আসেন। তাদের কাছে শুধু চারা বিক্রি করি না। স্ট্রবেরি গাছ পরিচর্যার নিয়মকানুন, ওষুধের ব্যবহার এসব বিষয়ে পরামর্শও দিয়ে থাকি। কেউ গাছ লাগানোর পর ফল বিক্রি নিয়ে সমস্যায় পড়লে সহায়তা করে থাকি। আমি যখন শুরু করেছি, তখন কোনো পরামর্শ পাইনি। নিজে নিজে শিখতে হয়েছে। অন্যদের যেন সেই সমস্যায় না পড়তে হয়, সেই ভাবনা থেকে এই কাজ করি।