শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯:৫৭, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৯:৫৮, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৯৯ বছরের পুরনো, লন্ডনের ভীরাস্বামী রেস্তোরাঁ বন্ধের পথে। ছবি: সংগৃহীত।
৯৯ বছর ধরে টিকে থাকা একটি আইকনিক ভারতীয় রেস্তোরাঁ কি বন্ধ হয়ে যাবে? রাজা কি পারবেন একে রক্ষা করতে?
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে পুরনো টিকে থাকা ভারতীয় রেস্তোরাঁ ভীরাস্বামী (Veeraswamy) বন্ধ হওয়া ঠেকাতে প্রচারকারীরা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাকিংহাম প্যালেসে একটি পিটিশন জমা দেবেন। তারা রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আবেদন জানাচ্ছেন, খবর বিবিসি’র।
১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রেস্তোরাঁটি লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটে তার আদি অবস্থানেই রয়েছে। কিন্তু এর ল্যান্ডলর্ড 'দ্য ক্রাউন এস্টেট'-এর সাথে লিজ নবায়ন নিয়ে বিরোধের কারণে এটি এখন হুমকির মুখে।
রাজা চার্লস সব সময়ই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরির পক্ষে কথা বলেছেন। তাই রেস্তোরাঁটির সমর্থকরা একে "অংশীদারিত্বমূলক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত অংশ" হিসেবে রক্ষা করার জন্য তার সমর্থন চাইছেন।
তবে ক্রাউন এস্টেট জানিয়েছে, ভবনটির এমন কিছু সংস্কার প্রয়োজন যা রেস্তোরাঁটি চালু রেখে করা সম্ভব নয়। লিজ নবায়ন না করার এবং রেস্তোরাঁটিকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি তারা হালকাভাবে নেয়নি বলেও জানিয়েছে। উল্লেখ্য যে, ক্রাউন এস্টেট একটি স্বাধীন সম্পত্তি সংস্থা, যার লভ্যাংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেও সেবা দিয়ে যাওয়া ভীরাস্বামীকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ইতিমধ্যে ১৮,০০০-এর বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। রেমন্ড ব্লাঙ্ক, মিশেল রক্স এবং রিচার্ড করিগানের মতো বিখ্যাত শেফরা এই মিশেলিন-স্টার প্রাপ্ত রেস্তোরাঁটি বন্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। করিগান প্রশ্ন তুলেছেন, "ইউরোপের বেশিরভাগ শহর তাদের ঐতিহাসিক রেস্তোরাঁগুলোকে আগলে রাখে, তাহলে আমরা কেন ভীরাস্বামীকে হারাতে চাইব?"
আগামী মার্চ মাসে রেস্তোরাঁটি ১০০ বছরে পা দেবে। পিটিশনে রাজাকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন তিনি এই "ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান" এবং "ভারত-ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীকটিকে" রক্ষা করেন। সমর্থক ও শেফরা মিলে এই পিটিশন বাকিংহাম প্যালেসের গেটে নিয়ে যাবেন। এছাড়া মার্চ মাসে একটি শতবর্ষী নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে যেখানে অনেক তারকা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।
সোহো সোসাইটির চেয়ারপারসন লুসি হেইন এই লড়াইয়ে সংহতি প্রকাশ করে বলেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই আইকনিক রেস্তোরাঁটি বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।
লুসি হেইন বলেন, এটি বন্ধ হয়ে যাওয়া হবে "লন্ডনের ইতিহাস এবং রন্ধনশৈলীর ঐতিহ্যের জন্য এক বিশাল ক্ষতি"। সোসাইটি চায় রেস্তোরাঁটিকে একটি "কমিউনিটি ভ্যালু অ্যাসেট" বা জনগুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
বর্তমানে ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ যুক্তরাজ্যের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, ভীরাস্বামী যখন যাত্রা শুরু করেছিল তখন এটি ছিল এক বৈপ্লবিক পথপ্রদর্শক। শুরুতে এটি মূলত লন্ডনে বসবাসরত সেই সব অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের আকর্ষণ করত যারা ভারতে ফেলে আসা স্বাদগুলো মিস করতেন।
রেস্তোরাঁটির সহ-মালিক রঞ্জিত মাথরানি জানান, ভারতের সাথে যুক্ত জেনারেল, সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীরা এখানে প্রথম আসা শুরু করেন। মহাত্মা গান্ধী এবং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও ছিলেন এর গ্রাহকদের তালিকায়।
পরবর্তীতে এটি ওয়েস্ট এন্ডের একটি ফ্যাশনেবল কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে চার্লি চ্যাপলিন ও মার্লন ব্র্যান্ডোর মতো অভিনেতা এবং স্যার উইনস্টন চার্চিলের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আনাগোনা ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রিন্সেস অ্যান, ডেভিড ক্যামেরন এবং অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবার এখানে অতিথি হিসেবে এসেছেন।
বাকিংহাম প্যালেসের সাথে এই রেস্তোরাঁটির সম্পর্ক বেশ পুরনো—২০০৮ এবং ২০১৭ সালে গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় অতিথিদের জন্য এই রেস্তোরাঁর শেফরাই খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন।
এমনকি এটি দাবি করে যে, ব্রিটিশদের সবচেয়ে প্রিয় কম্বিনেশন 'কারি এবং বিয়ার'-এর জন্ম এখানেই। ১৯২০-এর দশকে ডেনমার্কের প্রিন্স অ্যাক্সেল এখানে বসে কার্লসবার্গ বিয়ার পান করতে পছন্দ করতেন, যেখান থেকেই এই যুগলবন্দির শুরু।
মাথরানি বলেন, তার রেস্তোরাঁটি ব্রিটেনে ভারতীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভারতীয় রেস্তোরাঁগুলোর জন্য ভীরাস্বামীই পথ প্রশস্ত করেছিল।
তিনি আরও জানান, গ্রাহকদের জীবনে এই রেস্তোরাঁটি এক আবেগঘন স্থান হয়ে আছে। তিনি বলেন, "অনেকে এসে বলেন, '১২ বছর বয়সে আমি আমার গডফাদারের সাথে প্রথম এখানে এসেছিলাম' অথবা 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এখানে আমাদের বাগদান হয়েছিল' কিংবা '১৯৫০-এর দশকে আমার কাকা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন'।"
সহ-মালিক আশা করছেন, রাজা হয়তো রেস্তোরাঁটির সমর্থনে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবেন। তবে বাকিংহাম প্যালেস জানিয়েছে, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে 'ক্রাউন এস্টেট'-এর এখতিয়ারাধীন।