শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫:৪০, ২৪ মার্চ ২০২৬
ইসি প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ মঙ্গলবার ক্যানবেরায় যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। ছবি: সংগৃহীত।
অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) মঙ্গলবার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে এই চুক্তির পাশাপাশি দেশগুলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বিরল খনিজ সম্পদের প্রাপ্যতা বৃদ্ধির বিষয়েও একমত হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন এমন এক সময়ে অস্ট্রেলিয়া সফর করছেন যখন ২৭ জাতির এই ব্লক এবং আমদানিনির্ভর দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে উদ্ভূত জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, খবর রেডিও ফ্রান্স ইন্পারন্যাশনালের। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছ থেকে আসা বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টায় ব্রাসেলস এই সর্বশেষ চুক্তিটি সম্পন্ন করল।
আট বছরের দীর্ঘ আলোচনার পর ইউরোপীয় ভৌগোলিক নাম ব্যবহার এবং ইউরোপে কতটুকু গরুর মাংস রপ্তানি করা যাবে—এমন কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর মাধ্যমে এই চুক্তিটি সম্ভব হয়েছে।
চুক্তির একটি আপস অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার ওয়াইন প্রস্তুতকারকরা অভ্যন্তরীণভাবে 'প্রোসেকো' (prosecco) শব্দটি ব্যবহার করতে পারবেন, তবে ১০ বছর পর রপ্তানির ক্ষেত্রে এই নাম ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এছাড়া যেসব উৎপাদক অন্তত পাঁচ বছর ধরে 'ফেটা' (feta) বা 'গ্রুয়ের' (gruyere)-এর মতো ভৌগোলিক নামগুলো ব্যবহার করছেন, তারা সেগুলো চালিয়ে যেতে পারবেন।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর লাক্সারি কার ট্যাক্সের সীমা বাড়িয়ে দেওয়ায় ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা উপকৃত হবেন। এর ফলে এখন থেকে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি এই কর থেকে অব্যাহতি পাবে।
দুই পক্ষ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদের বিষয়েও সম্পর্ক জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে উরসুলা ফন ডার লেয়েন বর্তমান বিশ্বকে অত্যন্ত 'নিষ্ঠুর ও ক্ষমাহীন' হিসেবে বর্ণনা করেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ইইউ এবং অস্ট্রেলিয়া অভিন্ন মূল্যবোধে আবদ্ধ এবং খনিজ সম্পদের জন্য চীনের মতো দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে তাদের অবশ্যই একযোগে কাজ করতে হবে।
উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেন, "এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের জন্য আমরা কোনো নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে পারি না, আর ঠিক এই কারণেই আমাদের একে অপরকে প্রয়োজন।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের নিরাপত্তা মানেই আপনাদের নিরাপত্তা। আমাদের নতুন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা একে অপরের পাশে থাকব।"
মঙ্গলবার আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন যে, এই বাণিজ্যিক চুক্তিটি একটি 'ন্যায়সংগত চুক্তি', যা উভয় পক্ষের ব্যবসায়ীদের জন্যই সুফল বয়ে আনবে। এই চুক্তির অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আশা করছে যে, আগামী এক দশকে অস্ট্রেলিয়ায় তাদের রপ্তানি এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পাবে।
আগামী ১০ বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অস্ট্রেলীয় গরুর মাংস রপ্তানির কোটা বর্তমান স্তরের তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি বাড়বে, যদিও এটি অস্ট্রেলীয় কৃষকদের প্রত্যাশার চেয়ে কম। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ফারমার্স ফেডারেশন এই চুক্তির ফলাফলে চরম হতাশা প্রকাশ করেছে। সংগঠনের সভাপতি হামিশ ম্যাকইনটায়ার বলেন, "অস্ট্রেলিয়া সরকার আজ যা গ্রহণ করেছে, তাতে প্রধান কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না যা ২০২৩ সালের অক্টোবরে সরকার সঠিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল।"
গত বছর ইইউ সংস্থাগুলো অস্ট্রেলিয়ায় ৩৭ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পণ্য এবং ২০২৪ সালে ৩১ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের সেবা রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে যে এই চুক্তির ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের জিডিপিতে ৭.৮ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার যোগ হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার চীন এবং বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস হলো যুক্তরাষ্ট্র। তবে ২০২০ সালে বেইজিংয়ের সাথে বিরোধের জেরে কৃষি পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর থেকে ক্যানবেরা তাদের রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। একইভাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও মার্কিন শুল্ক এবং চীনা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মুখে নতুন অংশীদারিত্বের সন্ধানে রয়েছে।
ফন ডার লেয়েনের এই সফর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে, যার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ইইউ প্রধান এই মাসেই বলেছেন যে, এই সংঘাত ইউরোপের দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। মঙ্গলবার তিনি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান। জ্বালানির জন্য বিদেশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল অস্ট্রেলিয়াও এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের চাপে রয়েছে।