শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:৫১, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
ডেনমার্কে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক গ্রিণল্যান্ড অধিকরণের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। সাম্প্রতিক ছবি: সংগৃহীত।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা ডেনমার্ক ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প আটটি মিত্র দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন, যাকে ইউরোপীয় নেতারা "অগ্রহণযোগ্য" বলে অভিহিত করেছেন।
শুল্ক আরোপ: ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ডের পণ্যের ওপর ১০% শুল্ক কার্যকর হবে। যদি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনো চুক্তি না হয়, তবে জুন মাস নাগাদ এই শুল্ক ২৫% পর্যন্ত বাড়তে পারে, খবর বিবিসি’র।
ইউরোপীয় নেতাদের ক্ষোভ: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই পদক্ষেপকে "সম্পূর্ণ ভুল" বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন একে "অগ্রহণযোগ্য" বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা ও কৌশলগত গুরুত্ব: গ্রিনল্যান্ড খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং এর ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝে, যা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নজরদারির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প একে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য "অপরিহার্য" মনে করছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি:
১. বিক্ষোভ: ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ড এবং ডেনমার্কে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে। ২. সামরিক তৎপরতা: ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশ গ্রিনল্যান্ডে একটি ছোট 'রিকনেসান্স মিশন' বা অনুসন্ধানমূলক দল পাঠিয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প হুশিয়ারি দিয়েছেন যে তারা একটি "বিপজ্জনক খেলা" খেলছে। ৩. ন্যাটোর ভূমিকা: ইউরোপীয় দেশগুলো বলছে যে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা কোনো একক দেশের নয়, বরং ন্যাটোর (NATO) যৌথ দায়িত্ব হওয়া উচিত।
ট্রাম্পের বক্তব্য: ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, যতক্ষণ না গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হচ্ছে, ততক্ষণ এই শুল্ক জারি থাকবে। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলটি "সহজ উপায়ে" অথবা "কঠিন উপায়ে" দখল করতে প্রস্তুত।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সাথে সরাসরি আলোচনা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে যাতে এই বাণিজ্যিক যুদ্ধ এড়ানো যায়।
গ্রিনল্যান্ড সংকট: ইউরোপের পাল্টা হুঁশিয়ারি এবং বাণিজ্যিক অস্থিরতা
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির প্রতিবাদে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে। এই সংবাদের মূল বিষয়গুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
ইউরোপীয় নেতাদের কঠোর প্রতিক্রিয়া
ফ্রান্স (ইমানুয়েল ম্যাক্রন): ম্যাক্রন স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এ ধরনের প্রেক্ষাপটে শুল্কের হুমকি "অগ্রহণযোগ্য" এবং তারা কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা হুমকিতে নতি স্বীকার করবেন না।
সুইডেন (উলফ ক্রিস্টারসন): সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "আমরা ব্ল্যাকমেইল হতে দেব না।" সুইডেন বর্তমানে নরওয়ে, যুক্তরাজ্য এবং ইইউ দেশগুলোর সাথে একটি যৌথ পাল্টা জবাব তৈরির বিষয়ে আলোচনা করছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিল (আন্তোনিও কস্তা): তিনি জানিয়েছেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় সর্বদা দৃঢ় থাকবে, যা তাদের সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড রক্ষার মাধ্যমে শুরু হয়।
ডেনমার্ক (লার্স লোকে রাসমুসেন): ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, ট্রাম্পের এই হুমকি তাদের কাছে সম্পূর্ণ "অপ্রত্যাশিত" ছিল।
ইইউ-ইউএস (EU-US) বাণিজ্য চুক্তিতে কালো মেঘ
জার্মান এমপি এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ইপিপি (EPP) গ্রুপের প্রধান মানফ্রেড ওয়েবার এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত বছর স্বাক্ষরিত ইইউ-ইউএস বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চুক্তি অনুযায়ী, ইইউ পণ্যের ওপর ১৫% শুল্ক এবং নির্দিষ্ট কিছু মার্কিন পণ্যের ওপর ০% শুল্ক থাকার কথা ছিল।
ওয়েবার জানিয়েছেন, ট্রাম্পের এই হুমকির মুখে এই মুহূর্তে চুক্তির অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয় এবং মার্কিন পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত ০% শুল্ক স্থগিত করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: "নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি"
জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ ফক্স নিউজকে বলেন, উত্তর অঞ্চলের (আর্কটিক) নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ডেনমার্কের নেই। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় গ্রিনল্যান্ডের মানুষ আরও "নিরাপদ, শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ" হবে।
আকস্মিক এই উত্তেজনার কারণ
মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য একটি উচ্চ-পর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করতে রাজি হয়েছিল। কূটনৈতিক মহলে একে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, কিন্তু ট্রাম্পের হঠাৎ এই শুল্ক আরোপের ঘোষণা পুরো পরিস্থিতিকে আবার অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
সারকথা: ট্রাম্প তার প্রিয় অস্ত্র 'ট্যারিফ' বা শুল্ক ব্যবহার করে ইউরোপকে চাপ দিচ্ছেন, কিন্তু ইউরোপও এবার পাল্টা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের গণমানুষের প্রতিবাদ: "গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়"
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ন্যাটো (NATO) মিত্রদের মধ্যে সম্পর্ক এখন চরম উত্তেজনার মুখে। তবে এই পুরো সংকটের কেন্দ্রে থাকা গ্রিনল্যান্ডের মানুষের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।
জনমত ও বিক্ষোভের মূল পয়েন্টগুলো:
জনমত: সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের ৮৫% মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবের ঘোর বিরোধী।
রাজপথের প্রতিবাদ: শনিবার শুল্ক ঘোষণার আগেই গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক (Nuuk) এবং ডেনমার্কের প্রধান শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।
স্লোগান ও দাবি: বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— "Hands Off Greenland" (গ্রিনল্যান্ড থেকে হাত সরাও) এবং "Greenland for Greenlanders" (গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীদের জন্য)। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ড কোনো পণ্য নয় যা কেনা বা বেচা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ: গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন নিজে এই বিক্ষোভে যোগ দেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের সাথে নিয়ে মার্কিন কনসুলেটের দিকে অগ্রসর হন এবং স্লোগান দেন— "আমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ব।"
আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:
মার্কিন কংগ্রেসের উদ্বেগ: কাকতালীয়ভাবে, এই উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধি দল ডেনমার্ক সফর করছে। দলের নেতা ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস কুনস ট্রাম্পের এই ধরনের বক্তব্যকে "গঠনমূলক নয়" বলে সমালোচনা করেছেন।
আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার: গ্রিনল্যান্ডের সংগঠন 'ইনুইট' (Inuit)-এর প্রধান কামিলা সিজিং দাবি করেছেন যে, ডেনিশ রাজত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সম্মান জানাতে হবে।
সারসংক্ষেপ: ট্রাম্প যেখানে গ্রিনল্যান্ডকে একটি "রিয়েল এস্টেট" বা কৌশলগত ভূখণ্ড হিসেবে দেখছেন, সেখানকার মানুষ এবং নেতৃত্ব একে তাদের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের লড়াই হিসেবে দেখছেন। মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপের এই জেদ আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ইতিহাসের অন্যতম কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।