শিরোনাম
বাসস
প্রকাশ: ২০:২১, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
একাধিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গত কয়েক সপ্তাহে একটি ফিলিস্তিনি বেদুইন গ্রাম থেকে ১০০-এর বেশি মানুষকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে এবং এই ধারা অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
জামিলা রশিদের মতো অনেকের কাছে দক্ষিণ জর্ডান উপত্যকার রাস আইন আল-আউজা গ্রামটি ছিল দশকের পুরনো ঠিকানা। কিন্তু জানুয়ারির শুরুতে তিনি সপরিবারে ঘর ছাড়তে বাধ্য হন। জামিলা জানান, বসতিস্থাপনকারীদের হয়রানি সহ্যসীমার বাইরে চলে গিয়েছিল। এমনকি তারা বাড়িতে এবং রান্নাঘরে ঢুকে পড়ায় শিশুরা প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। গত তিন বছর ধরে এই কষ্ট চললেও সম্প্রতি তা চরম আকার ধারণ করেছে, খবর ডিডাব্লিউ-এর।
সহিংসতার ভয়াবহ বৃদ্ধি
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি এবং তাদের সম্পদের ওপর সেটলারদের আক্রমণের হার গত এক বছরে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ইজরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) এবং নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে উগ্রবাদী ইজরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের হামলার সংখ্যা ২৭% বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাস্তুচ্যুতির পরিসংখ্যান
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় সংস্থা (OCHA)-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৭০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি পরিবার বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই বেদুইন এবং পশুপালনকারী সম্প্রদায়, যারা পশ্চিম তীরের 'এরিয়া সি' (Area C)-তে বসবাস করতেন। এই এলাকাটি সম্পূর্ণভাবে ইজরায়েলি প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইজরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি'তসেলেম (B'Tselem) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৪টি ফিলিস্তিনি জনপদ সম্পূর্ণভাবে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
যেভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে
রাস আইন আল-আউজা গ্রামের পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে। তখন ইজরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা গ্রামের ভেতরে একটি অবৈধ চৌকি (Outpost) স্থাপন করে। তারা ট্র্যাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা শুরু করে এবং গ্রামের একপাশের যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এভাবেই নিরবচ্ছিন্ন হয়রানি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সালামেহ কা'আবনা গত কয়েক বছর ধরে বসতিস্থাপনকারীদের অসংখ্য হামলা এবং তাদের জনপদ ঘিরে ফেলার অপচেষ্টা দেখে আসছিলেন। কিন্তু যখন তার বাড়ি ও পরিবার থেকে মাত্র কয়েক ডজন মিটার দূরে বসতিস্থাপনকারীরা একটি ছোট অবৈধ চৌকি (আউটপোস্ট) স্থাপন করে, তখন নিরাপত্তার শেষ আশাটুকুও বিলীন হয়ে যায়।
কা'আবনা পাশের ওই চৌকির দিকে তাকিয়ে বলেন, যেখানে দুজন সেটলার একটি গাধা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, "তারা আমাদের রাস্তা ব্যবহার করতে বাধা দিচ্ছে এবং পানির ট্যাঙ্কগুলো আটকে দিয়েছে। রাতে তাদের অনেকে আমাদের শোবার ঘরের কাছাকাছি চলে আসে। এতে শিশুরা ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।"
চলমান হামলার মুখে গত মাসের শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি বড় পরিবারের প্রায় ১৩০ জন মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। রশিদ এবং তার ছোট পরিবারও এখন তাদের সাথে যোগ দেবে। রশিদ অত্যন্ত বেদনার সাথে বলেন, "এটি অপমানজনক এবং অত্যন্ত কষ্টদায়ক। নিজের হাতে নিজের বাড়ি ভেঙে ফেলার চেয়ে কঠিন আর কী হতে পারে? আর আমরা জানিও না আমরা এখন কোথায় যাব।"
জর্ডান উপত্যকার সেই শীতের রোদেলা দিনে আরও অনেক পরিবারকে তাদের মালপত্র গোছাতে দেখা যায়। আশেপাশে তখন ভেড়া, ছাগল আর গাধার ডাক শোনা যাচ্ছিল। এই পশুপালনই ছিল গ্রামের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস, কিন্তু চারণভূমিতে যাওয়া অনিরাপদ হয়ে পড়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে পশুগুলোকে খোয়াড়েই আটকে রাখা হয়েছিল। এখন সেই পশু আর প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ছোট পিকআপ ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রামাল্লাহ থেকে আসা কিছু যুবক গ্রামবাসীদের ঘরবাড়ি ও পশু রাখার জায়গাগুলো ভেঙে ফেলতে সাহায্য করছেন।
গ্রামের আরেকজন বাসিন্দা মোহাম্মদ আবু ফাদি বিষণ্ণ দৃষ্টিতে এই দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি তখনও নিশ্চিত ছিলেন না যে তিনি থাকবেন নাকি চলে যাবেন। তিনি বলেন, "প্রতিদিন দিন-রাত তারা ঘোড়া নিয়ে আসে এবং হয়রানি করে। এর প্রভাব ছোট শিশু, পশুপাখি—সবার ওপর পড়ছে। এটি মোটেও মানবিক আচরণ নয়।"
হয়রানির একটি নির্দিষ্ট ধরণ
রাস আইন আল-আউজা গ্রামের এই পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই গ্রামটি বেশ কয়েকটি অবৈধ বসতি ও আউটপোস্ট দিয়ে ঘেরা। একই ধরণের ঘটনা মুয়রাজাত এবং মুঘাইর আল-দেইরের মতো অন্যান্য ফিলিস্তিনি জনপদেও বারবার ঘটছে। সেখানেও বসতিস্থাপনকারীরা গ্রামের মাঝখানে আউটপোস্ট তৈরি করে হামলা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করছে।
বসতি-বিরোধী পর্যবেক্ষণ সংস্থা 'পিস নাউ' (Peace Now)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিম তীরজুড়ে ১৪৯টিরও বেশি বসতি এবং ২২৪টি ছোট অননুমোদিত আউটপোস্ট ও খামার ছড়িয়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বসতিগুলো অবৈধ হলেও ইজরায়েল তা অস্বীকার করে আসছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর দখল করার পর একের পর এক ইজরায়েলি সরকার এই বসতি সম্প্রসারণকে উৎসাহ দিয়ে আসছে।
বর্তমান কট্টরপন্থী সরকারের অধীনে অনেক বসতিস্থাপনকারীকে সরকারের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সরকার ১৯টি নতুন বসতি স্থাপন বা বৈধ করার ঘোষণা দিয়েছে এবং 'E1' নামক একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে, যা পশ্চিম তীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলবে। জার্মানি সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ দেশ মনে করে, এই ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপন একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথে প্রধান অন্তরায়।