ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:৪১, ৯ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫০, ৯ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত।
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টিকারী এই যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ও আলোচনায় সম্মত হয়েছিল ওয়াশিংটন ও তেহরান। কিন্তু এই চুক্তির ফাটল খুব দ্রুতই প্রকাশ পায় যখন ইসরায়েল তার প্রতিবেশী দেশ লেবাননে ভয়াবহ হামলা চালায়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বৈরুতে গত মার্চের পর সবচাইতে বড় ধরনের এই হামলা চালানো হয়, খবর ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোর ডট কম-এর।
ইসরায়েল জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের এই লড়াই ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ নয়। একই সুর শোনা গেছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের গলায়। পাকিস্তানে ইরানের সাথে আসন্ন আলোচনার আগে তিনি বলেন, লেবানন ইস্যু এই যুদ্ধবিরতির অংশ ছিল না এবং ইরান যদি এই অযুহাতে আলোচনা থেকে সরে যেতে চায় তবে সেটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করে এই যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আলোচনার যে ভিত্তি ছিল তা ইতোমধ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে, যার ফলে পরবর্তী আলোচনা এখন অযৌক্তিক হয়ে পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে এই সমঝোতা হলেও তা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান যে ১০ দফা পরিকল্পনা দিয়েছে তা হোয়াইট হাউসের সম্মত হওয়া শর্তাবলির সাথে মিলছে না।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে কোনো সতর্কতা ছাড়াই চালানো এই হামলার পর সেখানে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক এই প্রাণহানির মাত্রাকে 'ভয়াবহ' বলে বর্ণনা করেছেন।
"কর্নশ আল-মাজরা এলাকায় স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম, হঠাৎ মানুষজন দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে এবং চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়," হামলার শিকার একটি এলাকা সম্পর্কে এভাবেই বলছিলেন আলি ইউনেস।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, গত মাসে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননে ১,৭০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, ইসরায়েল যদি হামলা বন্ধ না করে তবে তারা তাদের "কর্তব্য পালন করবে এবং উপযুক্ত জবাব দেবে"। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, পাল্টা আঘাত করার "অধিকার" তাদের আছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, প্রয়োজনে ইরানের মোকাবিলা করতে তারা প্রস্তুত এবং তাদের কিছু "লক্ষ্য পূরণ করা এখনো বাকি"। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মতে, লেবাননে হিজবুল্লাহকে "নিরস্ত্র" করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সংঘাত পুনরায় ছড়িয়ে পড়লে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের আলোচনা
ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারির মুখে ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে রাজি হওয়ার পর আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বুধবার এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছিল। কিন্তু কিছু খবরে জানা গেছে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দিনের শেষভাগে জলপথটি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে হোয়াইট হাউস ইরানকে "অবিলম্বে, দ্রুত এবং নিরাপদে" এটি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, প্রণালী বন্ধ করা "সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য"।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যার দেশ এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ সকল পক্ষকে "সংযম প্রদর্শন এবং দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে সম্মান করার" আহ্বান জানিয়েছেন যাতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সফল হতে পারে।
যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বুধবার জানিয়েছে যে, তাদের তেল স্থাপনায় বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোতে নতুন করে "ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা" চালানো হয়েছে। কুয়েত জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা "তীব্র হামলায়" তাদের তেল স্থাপনা, বিদ্যুৎ ও পানি শোধন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে তারা ১৭টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৫টি ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সৌদি আরব ৯টি ড্রোন প্রতিহত করেছে এবং বাহরাইন জানিয়েছে তাদের রাজধানী মানামায় হামলা হয়েছে।
'প্রকৃত আশা'
বুধবার বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় নেতা, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের একটি "দ্রুত এবং স্থায়ী সমাধান" বের করতে হবে। পোপ লিও এই মুহূর্তটিকে "প্রকৃত আশার" সময় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের দাবিগুলোর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাপক অমিল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিতেই এই হামলা চালিয়েছে।
কয়েক সপ্তাহের অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় তেলের দাম ১৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ২০ শতাংশ কমেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র "অনেকটা এগিয়েছে" এবং ইরানের দেওয়া ১০ দফা পরিকল্পনাকে তিনি "কার্যকর" বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে গালিবফ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনটি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন: লেবাননে ক্রমাগত হামলা, ইরানি আকাশসীমায় ড্রোনের প্রবেশ এবং দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার অস্বীকার করা। ফলে এই যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।
তেহরানে বুধবার রাস্তাঘাট অন্য সময়ের চেয়ে শান্ত ছিল। মার্কিন হামলার আশঙ্কায় দীর্ঘ উদ্বেগময় রাত কাটানোর পর অনেক দোকানপাট বন্ধ ছিল। ৫০ বছর বয়সী গৃহিণী সকিনা মোহাম্মদী বলেন, "সবাই এখন স্বস্তিতে আছে। আমি আমার দেশকে নিয়ে গর্বিত। আমরা এখন অনেক বেশি নিশ্চিন্ত।"