ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

পাকিস্তানে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ২২:৪৯, ১০ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ২২:৫৮, ১০ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স

প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।

শুক্রবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ নিরসন ও হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে, যদিও যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও পরিস্থিতি এখনও স্থবির হয়ে আছে।

লেবাননে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় এই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি হুমকির মুখে পড়ায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও, পাকিস্তান তার রাজধানীতে এই দুই দেশের প্রতিনিধি দলের আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে, খবর ইউরো নিউজের। 

পৃথকভাবে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল এবং লেবানন আলোচনায় বসবে। ইরানের মদদপুষ্ট হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতিকে নস্যাৎ করে দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইসলামাবাদ এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনার জন্য জোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে। সরকারি সূত্রমতে, এই আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ বাণিজ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো স্থান পাবে।

ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং প্রতিনিধি দলের জন্য নির্ধারিত বিলাসবহুল হোটেলটি খালি করা হয়েছে। তবে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তাদের অংশগ্রহণ নির্ভর করছে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের ওপর। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, "যুদ্ধ শেষ করার আলোচনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি পালনের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে লেবানন ফ্রন্টে।" তিনি আরও জানান, ভ্রমণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলে প্রতিনিধি দলের সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে।

তা সত্ত্বেও, ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম অনুযায়ী ইরানের অভিজাত রেভোলিউশনারি গার্ডস (IRGC) যুদ্ধবিরতির প্রতি তাদের অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছে। তারা বলেছে যে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে তারা কোনো দেশের ওপর হামলা চালায়নি।

গত বুধবার লেবাননে ইসরায়েলের চালানো ভয়াবহ হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, যা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তান জোর দিয়ে বলেছে যে, লেবাননকেও এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ওয়াশিংটনও সমান্তরাল আলোচনায় বৈরুতকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, তারা আগামী সপ্তাহে ইসরায়েল ও লেবাননের সাথে যুদ্ধবিরতি আলোচনার আয়োজন করবেন। যদিও ইসরায়েল বা লেবানন সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই আলোচনার কথা নিশ্চিত করেনি, তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে লেবাননের সাথে সরাসরি আলোচনার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই এই ঘোষণাটি এলো।

এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেবানন সরকারের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় বসার আগে বৈরুত একটি যুদ্ধবিরতি চায়।

শুক্রবার ভোরেও সংঘাত থামেনি; তেল আবিবসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন অংশে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা সীমান্ত এলাকায় এবং ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় একটি শহরে ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়েছে।

'তারা ভুল করছে'
প্রতিনিধিদের আগমনের প্রস্তুতি হিসেবে পাকিস্তানে শুক্রবার থেকে দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানী ইসলামাবাদের অধিকাংশ রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ফলে পুরো শহরটি এখন জনশূন্য।

হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এই সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার পথ প্রশস্ত করা।

ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার ফলে পাকিস্তানের এই আলোচনার গুরুত্ব হারিয়ে গেছে। তাদের মতে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ডিলিট করে দিয়েছেন, যেখানে ইরানি প্রতিনিধি দলের পৌঁছানোর কথা উল্লেখ ছিল।

তা সত্ত্বেও, শনিবার মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের আসার কথা রয়েছে। তার সঙ্গে থাকবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার।

মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় নতুন করে ফাটল দেখা দেয় যখন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ লেবাননে ইসরায়েলি হামলার তীব্র সমালোচনা করে একটি পোস্ট দেন। তবে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই মন্তব্যকে 'আপত্তিকর' আখ্যা দিয়ে বলেছে যে, শান্তি স্থাপনের জন্য যারা নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হওয়ার দাবি করে, তাদের কাছ থেকে এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।

পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না, যা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ভূমিকাকে জটিল করে তুলতে পারে। পাকিস্তান জোর দিয়ে বলছে যে যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত, যা ইসরায়েল অস্বীকার করছে।

যুদ্ধবিরতি ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কায় জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ সতর্ক করেছেন যে, লেবাননে ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকলে পুরো শান্তি প্রক্রিয়া ব্যর্থ হতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন যে, যারা ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাবে, তাদের ওপর পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকবে।

ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ইসরায়েল লেবাননে তাদের হামলা কমিয়ে আনছে এবং নেতানিয়াহু তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে এই আক্রমণগুলো এখন থেকে সীমিত পরিসরে হবে।

'ইরান খুব খারাপ কাজ করছে'
আলোচনা যদি শুরু হয়, তবে মূল বিতর্কের বিষয় হবে হরমুজ প্রণালী। এই পথে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার পরিবহন করা হয়।

ট্রাম্প ইরানকে অভিযুক্ত করে বলেছেন যে, তারা এই প্রণালী দিয়ে তেল চলাচলে বাধা দিয়ে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরানকে সতর্ক করে বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আরোপ করা চুক্তির পরিপন্থী।

এদিকে মেরিন ট্রাফিক-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর প্রথম কোনো অনিরানি তেল ট্যাঙ্কার হিসেবে গ্যাবন-পতাকাবাহী 'এমএসজি' বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন