শিরোনাম
বিবিসি নিউজ বাংলা
প্রকাশ: ০৮:৫৮, ১৪ মার্চ ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত।
”আজ আমার বিয়ে। আনন্দ করতে আত্মীয়রা বাড়িতে জড়ো হয়েছিলেন। কিন্তু এখন সবাই গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য লাইন দিয়েছেন", জানাচ্ছিলেন সালোনি।
সংবাদ সংস্থা এএনআইকে উত্তরপ্রদেশের লখনৌ শহরের এই বাসিন্দা জানাচ্ছিলেন, তিনি ভাবতেও পারেননি তাঁর বিয়ের দিন বাবা-দাদাদের গিয়ে সিলিন্ডারের জন্য লাইন দিতে হবে।
ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে তামিলনাডু রাজ্যের ম্যারেজ হল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, মার্চ-এপ্রিল মাসে ওই রাজ্যে প্রায় ২০,০০০ বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। যার জন্য ২ লাখ গ্যাস সিলিন্ডার দরকার।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে গ্যাসের সংকট। ফলে কী ভাবে এত সংখ্যক গ্যাস সিলিন্ডার নিশ্চিত করা যাবে, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।
শুধু এই দুই শহরে নয়, বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহের জন্য সাড়া ভারত জুড়ে বহু দম্পতি তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা পেছাতে বাধ্য হয়েছেন বলে খবর মিলেছে।
যদিও পশ্চিমবঙ্গে এই সময়ে কয়েক সপ্তাহের জন্য বিয়ের মরশুমে বিরতি রয়েছে, তবে এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন বিয়ের মরশুমে কী হবে, সেই চিন্তা ইতিমধ্যেই গ্রাস করেছে ভাবী দম্পতি ও বিয়ের সঙ্গে যুক্ত পেশাদারদের।
পশ্চিমবঙ্গের এক ক্যাটারিং সংস্থার মালিক সৌরভ আদক জানিয়েছেন, "ফাল্গুন মাসে বিবাহের শুভ তিথিগুলি পার হয়ে গিয়েছে। বাংলা ক্যালেন্ডারের চৈত্র মাসে বিবাহ অনুষ্ঠানের চল নেই পশ্চিমবঙ্গে।"
"তবে সিলিন্ডার সাপ্লাইয়ে প্রভাব পড়েছে। বৈশাখ মাস পড়লেই ফের বিয়ের মরশুম শুরু হবে, তখন কী হবে জানা নেই!"
গ্যাসের বদলে কয়লা মজুত
ভারত জুড়েই মানুষের মনে তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সংক্রান্ত আতঙ্ক। দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ক্ষেত্র থেকে উদ্বেগের ছবি সামনে আসছে। পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে।
আগামী ১০ দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিয়ের বুকিং বাতিল করতে হবে বলে মনে করছে ক্যাটারিং সংস্থাগুলি।
রেস্তোরাঁ ও ছোট দোকানগুলিতে সিলিন্ডার সংক্রান্ত কোনও নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে জারি না হলেও একাধিক দোকান-মালিক সিলিন্ডারের ঘাটতির কথা বলেছেন।
অনেকে কয়লা মজুত করা শুরু করেছেন। কলকাতার অফিসপাড়ায় 'টিফিন এলাকা' বলে পরিচিত ডেকার্স লেনে অবস্থিত খাবারের দোকানগুলি ইতিমধ্যেই কয়লার আগুনে রান্না করা শুরু করেছে।
কলকাতার বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে কড়াপাকের মিষ্টি তৈরি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন নামী মিষ্টির দোকান সীমিত সংখ্যক মিষ্টি তৈরি করছে।
কিন্তু আগামী সপ্তাহে আদৌ যোগান স্বাভাবিক রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন কলকাতার মিষ্টি ব্যবসায়ীরা।
বিখ্যাত মিহিদানা, সন্দেশ তৈরিতে কাটছাঁট
শুধু কলকাতা নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে।
বর্ধমানের বিখ্যাত একটি মিষ্টির দোকানের মালিক জানিয়েছেন, তাঁরা ওই অঞ্চলের বিখ্যাত মিহিদানা তৈরি আপাতত বন্ধ রেখেছেন।
চন্দননগরের জলভরা সন্দেশের আবিষ্কর্তা বলে বিখ্যাত শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মালিক শৈবাল মোদক বিবিসিকে জানিয়েছেন, "গ্যাস ডিলাররা কবে দোকানে গ্যাস দিতে পারবেন, তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিতে পারছেন না।
"আমরা আমাদের সাধারণ প্রোডাকশন এক চতুর্থাংশে নামিয়ে নিয়ে এসেছি। আগামী পাঁচ দিনের গ্যাস মজুত থাকলেও এর পর ডিজেলের স্টোভ ব্যবহার করতে হবে। আমরা পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিয়ম মেনে ডিজেল ও কেরোসিন-চালিত স্টোভ ব্যবহার বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের আর কোনো উপায় নেই", বলছিলেন মি. মোদক।
দীর্ঘ হচ্ছে গ্যাসের লাইন
কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মধ্যে ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সংস্কৃতি ছাড়াও খাবার ও মিষ্টির টানে বহু বিদেশি পর্যটক পশ্চিমবঙ্গে আসেন। জ্বালানি সংকটের কারণে প্রভাব পড়তে পারে রাজ্যের পর্যটনশিল্পেও।
সরকারের পক্ষ থেকে বার বার 'দেশে জ্বালানি সংকট নেই' বলা হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্বালানির অভাবের ছবি সামনে এসেছে।
কলকাতা-সহ একাধিক বড় শহরে গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন অফিসের সামনে লম্বা লাইনের ছবি দেখা গেছে।
সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যেও দুশ্চিন্তা কাটছে না। বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিতে গ্যাসের যোগানে টান পড়েছে।
কলকাতার বিভিন্ন বড় রেস্তোরাঁ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, তারা মেনুতে কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিছু রেস্তোরাঁ মালিকের কথায়, এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তাঁরা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন।
কলকাতার এক নামী রেস্তোরাঁর মালিক পিয়ালি ব্যানার্জী বিবিসিকে জানিয়েছেন, "ঢিমে আঁচে রান্না হওয়ার কারণে বিরিয়ানি তৈরিতে বেশি গ্যাস খরচ হয়। তবুও বিরিয়ানি আমরা বন্ধ করতে পারব না, কারণ আমাদের রেস্তোরাঁ বিরিয়ানির জন্য বিখ্যাত। অন্যান্য আইটেমগুলি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করতে হচ্ছে।"
বাড়িতে রান্নার গ্যাসে কী প্রভাব?
যদিও এই সংকটের খুব বেশি প্রভাব এখনও ঘরোয়া গ্যাস সরবরাহে পড়েনি।
দক্ষিণ কলকাতার সন্তোষপুরের বাসিন্দা অপর্ণা নন্দী যেমন বলছিলেন, ডিলার তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে ঘরোয়া গ্যাসের সরবরাহ এখনই ব্যাহত হবে না।
১৩ই মার্চ শুক্রবার সকালে ভারতের সর্বাধিক জনপ্রিয় দুটি ই-কমার্স সাইট অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্টে 'ইন্ডাকশন' লিখে সার্চ করতেই দেখা গেল ঘরে ব্যবহার্য ইন্ডাকশন কুকস্টোভের লিস্টিংগুলির পাশে জ্বলজ্বল করছে 'আউট অব স্টক।' একই ছবি দোকানগুলিতেও।
কলকাতা, দিল্লির মতো বড় শহরগুলি বাদ দিলেও ছোট শহরগুলিতে একাধিক দোকানে হুড়মুড়িয়ে বিক্রি হয়েছে ইন্ডাকশন কুকস্টোভ।
ছোট-বড় দোকানিরা চাহিদার সঙ্গে যোগানের সামঞ্জস্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কী পদক্ষেপ সরকারের?
কেন্দ্র সরকারের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট করে জানানো হয়েছে, ঘরোয়া গ্যাসের সাপ্লাই ১০০ ভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
১২ই মার্চ এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা। ওই সম্মেলন থেকে ভারতের পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা জানান, মানুষ যে ঘরোয়া গ্যাসের জন্য লাইন দিচ্ছেন তা মূলতঃ আতঙ্কের প্রতিফলন।
মানুষকে 'প্যানিক বাইং' থেকে বিরত থাকারও অনুরোধ জানান তিনি।
ভারতে জ্বালানি সংকট নেই - কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে এই দাবি আসা সত্বেও বাণিজ্যিক গ্যাস বিতরণে কড়াকড়ি করছে কেন্দ্র ও রাজ্য,উভয় সরকারই।
এমনকি ঘরোয়া গ্যাস সিলিন্ডার বুকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রথম বুকিংয়ের পরে দ্বিতীয় বুকিংয়ের অন্তর্বর্তী সময় ২১ দিন থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ দিন করা হয়েছে।
১২ই মার্চের সাংবাদিক সম্মেলন থেকে সুজাতা শর্মা বলেন, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রগুলির জন্য হাসপাতাল ও স্কুলগুলিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু রাজ্যগুলির থেকে তাঁরা জানতে চেয়েছেন কোন কোন ক্ষেত্রগুলিতে সরবরাহ সুরক্ষিত করতে চায় রাজ্য সরকারগুলি।
রান্নার গ্যাসের সংকট মেটাতে ইতিমধ্যেই গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।
তিনি জানিয়েছেন, "হাসপাতাল, স্কুল, আইসিডিএস সেন্টার, সংশোধনাগার ও বাড়িতে ব্যবহার্য গ্যাসকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া হবে।"
১৩ মার্চ (শুক্রবার) ফের একটি সাংবাদিক সম্মেলনে পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব জানিয়েছেন, "এলপিজি গ্যাস হরমুজ প্রণালী হয়ে ভারতে আমদানি হয়, তবুও ভারতে কোথাও মজুতের ঘাটতি নেই।"
"গত কয়েক দিনে গড় বুকিং হয়েছে ৭৭ লাখের কাছাকাছি। যেখানে স্বাভাবিকভাবে ৫৫ লাখ বুকিং হয়ে থাকে", এই হঠাৎ বুকিং বৃদ্ধিকে মিস শর্মা 'প্যানিক বাইং'-এর প্রতিফলন বলেই মনে করছেন।
আশ্বাস সত্ত্বেও প্রভাব জরুরি ক্ষেত্রে
রাজ্য সরকারের আশ্বাস সত্ত্বেও কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাব পড়েছে বলে খবর মিলেছে।
কলকাতার একাধিক স্কুলে দুপুরের রান্না করা খাবার দেওয়া বন্ধ করে শুধু ডিমসিদ্ধ দেওয়া হয়েছে ছাত্রদের। রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন স্কুলে একই ছবি চোখে পড়েছে।
কলকাতা ও শহরতলিতে এলপিজি গ্যাস চালিত অটোরিকশাগুলি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সেখানেও ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে অটোচালক ইউনিয়নগুলির তরফে।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অঞ্চলে দরিদ্র পরিবারগুলির খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আইসিডিএস সেন্টার চালানো হয়। সেই সেন্টারগুলো জুড়ে দেখা গিয়েছে গ্যাস সরবরাহের আকাল।
বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার মতো জেলাগুলি থেকে গ্যাস সরবরাহে সমস্যার কারণে সীমিত পরিমাণে রান্নার খবর এসেছে। যার ফলে সমস্যায় পড়েছে একাধিক দরিদ্র পরিবার।
প্রভাব পড়েছে দেশের রেল ব্যবস্থাতেও। ভরতীয় রেলে খাদ্য সরবরাহকারী সংস্থা আইআরসিটিসিতেও পড়েছে প্রভাব।
আইআরসিটিসি পরিচালিত ক্যান্টিনগুলিতেও কমানো হয়েছে মেনু। রান্না হচ্ছে ইন্ডাকশন ও মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে।
ফলে, জরুরি ক্ষেত্রগুলিতে রান্নার গ্যাস সরবরাহও কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।