শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭:৪৭, ১৭ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩৫, ১৭ মার্চ ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত।
আফগান কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, সোমবার রাতে কাবুলের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের বিমান হামলায় অন্তত ৪০০ জন নিহত এবং ২৫০ জন আহত হয়েছেন। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে গত তিন মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনা।
উদ্ধারকর্মীরা যখন কাবুলের ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহগুলো বের করছিলেন, তখন পাকিস্তানের সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তারা আফগান কর্তৃপক্ষের এই দাবিকে "মিথ্যা" বলে অভিহিত করেছেন, খবর নিউইয়র্ক টাইমসের।
তারা আফগানিস্তানে মোট ছয়টি বিমান হামলা চালানোর কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছেন যে, তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল একটি গোলাবারুদ রাখার ডিপো।
তালেবান সরকারের একজন মুখপাত্র মঙ্গলবার সতর্ক করে বলেছেন যে, আফগানিস্তান এই হামলার প্রতিশোধ নেবে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেল। অথচ গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এই দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক হতো এবং তাদের জনগণের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে।
পাকিস্তানের অভিযোগ, তালেবান সরকার এমন একটি ইসলামি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে যারা গত কয়েক বছরে পাকিস্তানে শত শত হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের মূল উদ্দেশ্য এখনো অস্পষ্ট থাকলেও, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী তারা আফগানিস্তানের সামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় বেসামরিক বাড়িঘর, শরণার্থী শিবির এবং ২০টিরও বেশি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার যে ভবনটিতে হামলা হয়েছে সেটি তালেবান সরকার পরিচালিত একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দা এবং এনজিওগুলোর কাছে সুপরিচিত ছিল। আফগান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, হামলার সময় ওই ভবনে ২০০ জন রোগী অবস্থান করছিলেন, যা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
বিধ্বস্ত ভবনটির পাশে থাকা একটি সাইনবোর্ডে দারি ভাষায় লেখা ছিল "সাপোর্ট অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার, ওমিদ" (আশা)। মঙ্গলবার শত শত মানুষ ওই কেন্দ্রের সামনে ভিড় করেন তাদের স্বজনদের খোঁজে। বাসমিনা খুদাদাদি নামে এক নারী সেখানে তার ভাইয়ের খবর নিতে এসেছিলেন। তিনি জানান, ছয় সপ্তাহ আগে তার ভাইকে সেখানে ভর্তি করা হয়েছিল।
ইমার্জেন্সি নামক একটি এনজিওর কান্ট্রি ডিরেক্টর দেজান প্যানিক জানান, তাদের হাসপাতালে এই ঘটনায় আহত ২৭ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে সবসময় যুদ্ধের আওতামুক্ত এবং সম্মান জানানো উচিত।
হামলার পরপরই এবং পরের দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, তিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে অন্তত ৮০টি মরদেহ বের করতে বা ব্যাগে ভরতে দেখেছেন।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের আফগানিস্তান শাখার প্রধান ইয়াকোপো কারিদি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, "হতাহতের সংখ্যা শত শত।" তিনি আরও জানান যে, ওই এলাকায় তিনি কোনো সামরিক স্থাপনা দেখতে পাননি।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, "শুধুমাত্র আফগান তালেবান প্রশাসনের ব্যবহৃত অবকাঠামো লক্ষ্য করেই সুনির্দিষ্টভাবে সব হামলা চালানো হয়েছে।" গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে 'অঘোষিত যুদ্ধ' ঘোষণার পর থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানে ডজনখানেক হামলা চালিয়েছে।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ১ লক্ষ ১৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে এই অবস্থানকে তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সবুজ সংকেত হিসেবে বিবেচনা করছেন। এমনকি গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রধান সহযোগী দেশ চীন প্রকাশ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও পাকিস্তান আলোচনার আহ্বান উপেক্ষা করেছে।
আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধের সময় নির্মিত কিছু স্থাপনা এখন তালেবান কর্তৃপক্ষ ভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে; যেমন সাবেক সামরিক ঘাঁটিগুলোতে এখন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। ওমিদ মাদক নিরাময় কেন্দ্রটিও একটি সাবেক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থিত ছিল, যা কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিন মাইলেরও কম দূরত্বে।
মঙ্গলবার দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের মাঝে ডজন ডজন রক্তমাখা তোশক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। শত শত সশস্ত্র কর্মীর নজরদারিতে দমকল বাহিনী ও জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ সরিয়ে নিচ্ছে।
আফগান কর্মকর্তারা জানান, ধ্বংস হওয়া ভবনটি ছিল ১৮০ ফুট লম্বা একটি কাঠামো, যা মূলত খাওয়ার ঘর এবং নামাজের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পাশের ছোট ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপের ভেতর রোগীদের নীল ও সাদা গাউন, একই রকমের স্যান্ডেল এবং ওষুধের সিরাপের বোতল পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
এদিকে, বিবিসি-কে দেয়া ফরেনসিক ল্যাবরেটরি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানি বিমান হামলায় ১০০-রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
কাবুল ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সূত্রগুলো জানিয়েছে, কিছু মরদেহ এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে যে সেগুলো চেনা সম্ভব হচ্ছে না। তালেবান কর্মকর্তারা হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে দাবি করেছেন। জাতিসংঘ এই ঘটনার দ্রুত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবে এই কেন্দ্রে হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করে বলেছে যে, তারা সুনির্দিষ্টভাবে সামরিক স্থাপনা এবং সন্ত্রাসী সহায়তাকারী অবকাঠামো লক্ষ্য করে এই অভিযান চালিয়েছে।
গত মাসে এই আন্তঃসীমান্ত সংঘাত আবার শুরু হয়। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তান তাদের ভূখণ্ডে হামলাকারী জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যা কাবুল কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে আসছে।