ঢাকা, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

১৪ আষাঢ় ১৪৩৩, ১১ মুহররম ১৪৪৮

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৯:৪২, ৩ এপ্রিল ২০২৬

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

জেনারেল মিন অং হ্লাইং মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ছবি: কাঠমান্ডু পোস্টের সৌজন্যে।

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং শুক্রবার পার্লামেন্টে আয়োজিত এক ভোটে জয়ী হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পাঁচ বছর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করলেন তিনি।

গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একপাক্ষিক নির্বাচনে সেনাবাহিনী সমর্থিত দল বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে। সমালোচক ও পশ্চিমা দেশগুলো ওই নির্বাচনকে সামরিক শাসন দীর্ঘস্থায়ী করার একটি ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করলেও, জেনারেলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, খবর কাঠমান্ডু পোস্টের। 

২০২১ সালে নোবেলজয়ী অং সান সু চির সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ৬৯ বছর বয়সী এই জেনারেলকে বেশ কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। সু চিকে গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীতে জান্তাবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়।

শুক্রবার পার্লামেন্টে জান্তা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত কোটার আইনপ্রণেতারা মিন অং হ্লাইংয়ের পক্ষে অবস্থান নেন। এর ফলে তিনি বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন। শুরুতে জান্তার প্রধানমন্ত্রী ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল নিও স-এর থেকে পিছিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৪২৯ ভোট পান মিন অং হ্লাইং, যেখানে নিও স পান ১২৬ ভোট।

বিশ্লেষকদের মতে, মিন অং হ্লাইং দীর্ঘকাল ধরে এই পদের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে আসছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আসীন হওয়ার আগে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বেও বড় ধরনের রদবদল আনেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। গত সোমবার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনীত হওয়ার পর তিনি তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ইয়ে উইন ওউ-কে সেনাবাহিনীর উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নামমাত্র বেসামরিক সরকারের প্রধান হিসেবে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করা এবং আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়ার লক্ষ্যেই তার এই পদক্ষেপ। একই সঙ্গে গত ছয় দশকের মধ্যে পাঁচ দশকই সরাসরি দেশ শাসন করা সেনাবাহিনীর স্বার্থ রক্ষা করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

মিয়ানমার বিষয়ক স্বতন্ত্র বিশ্লেষক অং কিয়াও সোয়ে বলেন, “কমান্ডার-ইন-চিফ পদবি বদলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন তিনি অনেকদিন ধরেই দেখছিলেন এবং এখন মনে হচ্ছে তার সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে।”

ভোটের সময় মিন অং হ্লাইং সশরীরে উপস্থিত ছিলেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা যায়নি। তবে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের মিত্র চীন এই নতুন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নতুন সরকারকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রাণহানি ও বন্দিত্বের পরিসংখ্যান (২০২১–২০২৬)

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে সহিংসতার মাত্রা চরমে পৌঁছেছে:

নিহত: বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থার (যেমন ACLED ও AAPP) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে অন্তত ৯৩,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে জান্তা বাহিনীর সরাসরি হামলায় অন্তত ৭,৭৩৮ জন গণতন্ত্রপন্থী কর্মী ও সাধারণ বেসামরিক নাগরিক মারা গেছেন।

গণহত্যা: জান্তা সরকার এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০টি ম্যাসাকার বা হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, যেখানে অন্তত ৫,১৮০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

গ্রেপ্তার: রাজনৈতিক কারণে এবং জান্তাবিরোধী আন্দোলনের জন্য এখন পর্যন্ত ৩০,৩৫০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে ২২,৭৬২ জন এখনো কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা ও শরণার্থী সংকট

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে:

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত (IDP): ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মিয়ানমারের ভেতরে প্রায় ৩.৬ থেকে ৩.৭ মিলিয়ন (৩৬-৩৭ লক্ষ) মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিজ দেশে যাযাবর জীবনযাপন করছেন। ২০২১ সালের আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ লক্ষ।

রোহিঙ্গা শরণার্থী: ২০১৭ সালের দমন-পীড়ন এবং পরবর্তী সহিংসতার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১.২ মিলিয়ন (১২ লক্ষ) রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। ২০২৬ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১.৩ মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যান্য দেশ: প্রায় ১.৬ মিলিয়ন মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন।

বেসামরিক অবকাঠামো ও আকাশপথে হামলা

জান্তা বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যাপক বিমান হামলা ও অগ্নিসংযোগের পথ বেছে নিয়েছে:

বিমান হামলা: ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৯,৯০৭টি বিমান হামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ৪,৯১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬৫৬ জন শিশু।

অগ্নিসংযোগ: জান্তা বাহিনী সারাদেশে প্রায় ১১৩,০৫৪টি বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাগাইং (Sagaing) অঞ্চল, যেখানে প্রায় ৭৬,৯৯০টি বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে।

জাতিগত গোষ্ঠী ও সশস্ত্র প্রতিরোধ

মিয়ানমারের সংঘাত এখন আর কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং বামার (Bamar) প্রধান এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে:

বিদ্রোহী শক্তি: বর্তমানে 'পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস' (PDF) এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী (যেমন- কারেন, কাচিন, আরাকান আর্মি) দেশের একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

নিয়ন্ত্রণ: জান্তা সরকার বর্তমানে দেশটির ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র ১০৭টির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে, বাকি এলাকাগুলো হয় বিদ্রোহীদের দখলে অথবা প্রচণ্ড লড়াই চলছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন