শিরোনাম
বাসস
প্রকাশ: ২২:০৭, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ফাইল ছবি
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় ব্যক্তিগত জীবনে গভীর শোকের মুখে পড়েন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর মা, মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতি তাঁকে ব্যক্তিগত শোক কাটিয়ে ওঠার সুযোগ খুব বেশি দেয়নি। ঘটনাপ্রবাহ এতই দ্রুত এগোতে থাকে যে, দেশে ফেরার পর নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগও তিনি তেমন একটা পাননি।
তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে দীর্ঘদিন তাঁর মা নেতৃত্ব দিয়েছেন। নির্বাচনের আগে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর ওপর।
অনেকের মতে, বাবা-মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কাজে লাগিয়ে দেশের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তারেক রহমান দলকে আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। ৬০ বছর বয়সী এই নেতা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটাতে সক্ষম হন। দেশ পরিচালনা নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে নিজেকে রাষ্ট্রনায়কসুলভ ভাবমূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপির ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত হয়েছে এবং তারেক রহমান দেশের নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনের পর দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চিকিৎসা নিতে দেশ ছাড়ার পর প্রায় দেড় যুগ স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা মৃদুভাষী এই রাজনীতিকের জন্য নির্বাচনটি ভাগ্য ফেরার এক উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত হিসেবে হাজির হয়েছে।
অন্য এক আন্তর্জাতিক মাধ্যম মন্তব্য করে, ‘তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, দৃশ্যমান উপস্থিতি, সাধারণ মানুষের কাছে সহজগম্যতা এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি তাঁর পিতা জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী আদর্শকে ঘিরে থাকা তৃণমূলের সমর্থনকে নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত করেছে।’ তবে একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেন, এই উৎসাহের সঙ্গে এক ধরনের অনিশ্চয়তাও ছিল, যা নির্বাচনী প্রচারণাকে প্রত্যাশা ও সংশয়ের এক মিশ্র আবহে রেখেছিল।
এখন সেই সংশয়ের অনেকটাই কেটে গেছে। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার আওতায় দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সামনে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তারেক রহমানের এই উত্থানকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনে নির্বাসিত থেকে ফ্রান্সের নেতৃত্ব দেওয়া এবং পরবর্তীতে স্বদেশে ফিরে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণকারী ফরাসি নেতা শার্ল দ্য গলের সঙ্গে তুলনা করছেন। দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেও তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দল পরিচালনা করেছেন এবং দেশে ফিরে সরাসরি হাল ধরেছেন।
প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও তিনি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তাঁর দলের দীর্ঘ আন্দোলনের সফল নেতৃত্ব দেন।
নির্বাচনের আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ নিরাপদে থাকতে পারে।’
তাঁর ভাষায়, এ মুহূর্তে দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’।
দেশে ফেরার পর তিনি তুলনামূলক সংযত রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেন এবং উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এড়িয়ে সংযম ও পুনর্মিলনের আহ্বান জানান।
স্বদেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি বলেন, ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে।’ পরে ধীরে ধীরে সেই পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কোনো নির্দিষ্ট একক শক্তির ওপর অতি-নির্ভরতা এড়িয়ে চলা, ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সামাজিক সুরক্ষা প্রদান এবং তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি খেলনা ও চামড়াজাত শিল্পের মতো খাতগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। এছাড়া রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদের জন্য দুই মেয়াদ বা সর্বোচ্চ ১০ বছরের সময়সীমা নির্ধারণের যুগান্তকারী প্রস্তাব করেছেন।
তিনি স্বীকার করেছেন, ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশের দায়িত্ব নেওয়া সহজ হবে না। ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে তিনি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেছেন।
নির্বাচনের আগে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন, ‘আমরা আশা করি জনগণের কাছ থেকে একটি স্পষ্ট ও বড় ম্যান্ডেট পাওয়া যাবে।’ সেই ম্যান্ডেট এখন তাঁর হাতে, আর তা নিয়েই তিনি দেশ পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।