শিরোনাম
বাসস
প্রকাশ: ১৯:৫০, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাসস।
কবিতায় বাড়িকে কেবল একটি ভবন হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। হতে পারে এটি একটি স্থান; তবে এর সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, সাংস্কৃতিক শিকড়, এমনকি মানসিক অবস্থাও জড়িয়ে থাকে। মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট ‘বাড়ি’র সবচেয়ে উদ্ধৃত সংজ্ঞাগুলোর একটি দিয়েছেন এভাবে— বাড়ি হলো সেই স্থান, যখনই তুমি সেখানে যাও, সে তোমাকে গ্রহণ করতে বাধ্য।
তার কাছে বাড়ি মানে নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতা— আবেগ-জনিত নিরাপত্তার একটি স্থান, যদিও তা কখনো কখনো সীমাবদ্ধ বা জটিল মনে হতে পারে।
কিছু মানুষের জীবন তার জন্মশহরকে কেন্দ্র করে অতিবাহিত হয়। কারো জীবন গড়ে ওঠে একটি দেশকে কেন্দ্র করে।
তারেক রহমানের ক্ষেত্রে কখনো একটিমাত্র ঠিকানা ছিল না। ছিল বহু স্থান, বহু আঙিনা, বহু যাত্রা— যেগুলোর প্রত্যেকটি তার মননে এবং বাংলাদেশে তার অন্তর্ভুক্তির বোধে ছাপ রেখে গেছে।
তিনি ঢাকায় এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যা পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক ভাগ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষক এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পুত্র তিনি এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান।
কিন্তু, তার শৈশব কেবল প্রভাব বা ক্ষমতার পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি গড়ে উঠেছিল চলমানতার মধ্য দিয়ে— ইতিহাসের প্রবাহের মধ্য দিয়ে।
ক্যান্টনমেন্টের শৈশব, শৃঙ্খলা ও সরলতা :
তারেক রহমান মূলত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বেড়ে ওঠেন, বিশেষ করে শহীদ মইনুল রোডের লাল ইটের বাড়িটিতে। এটি কোনো প্রাসাদ ছিল না। ছিল সাধারণ, সংযত, প্রায় কঠোর— সবমিলিয়ে একজন সেনা কর্মকর্তার পরিবারের মূল্যবোধের প্রতিফলন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অতি অল্প বয়সে তিনি কিছু সময়ের জন্য পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বসবাস করেছেন। অনিশ্চয়তা, স্থানান্তর এবং জাতীয় সংগ্রামে চিহ্নিত সেই প্রারম্ভিক বছরগুলো তার মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করে যে, ব্যক্তিগত জীবন ও জাতীয় ইতিহাস প্রায় সময়ই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
যে বাড়িটি আর নেই :
শহীদ মইনুল রোডের বাড়িটি কেবল একটি বাসস্থান ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। অথচ, সেই ইতিহাস পরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলা হয় শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে।
১৯৭২ সালে উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর জিয়াউর রহমান বাড়িটিতে ওঠেন। সেনাপ্রধান এবং পরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি বিলাসিতা পরিহার করে সরলতা ও শৃঙ্খলাকে বেছে নিয়ে এই সাদামাটা বাসভবনেই থাকতে পছন্দ করেন। ১৯৮১ সালে তার হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তে বাড়িটি আনুষ্ঠানিকভাবে খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ করা হয়।
৩৮ বছর ধরে এটি ছিল পরিবারের প্রধান বাসভবন :
শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে নাটকীয়ভাবে রাষ্ট্র-সমর্থিত অভিযানের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দরজা ভেঙে ফেলে সবার সামনে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে অপমানিত করে। তাঁকে তাঁর ব্যক্তিগত সামগ্রী পর্যন্ত নিতে দেওয়া হয়নি।
এই উচ্ছেদ কেবল প্রশাসনিক ছিল না— এটি ছিল রাজনৈতিক। এটি ছিল প্রতিহিংসাপরায়ণ একটি শাসনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ, যার লক্ষ্য ছিল প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্তরাধিকার মুছে ফেলা এবং একটি পরিবারের সবচেয়ে ব্যক্তিগত পরিসর উপড়ে দিয়ে তাদের শাস্তি দেওয়া।
অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয় :
এরপর যা ঘটে, তা সংরক্ষণ বা পুনর্মিলন নয়, বরং প্রতিস্থাপন। যেখানে একসময় ইতিহাস দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে নির্মিত হয় বহুতল আবাসিক ভবন। যে আঙিনায় শিশুদের খেলা ছিল, যেখানে তারেক রহমান তার ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন, সেই স্থান মুছে ফেলা হয়— অপরিচিত করে দেওয়া হয়।
এখানেই তারেক রহমান ফুটবল খেলেছেন, নির্জন সময়ে ভাবনায় ডুবেছেন এবং ধীরে ধীরে একজন ছেলে থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। এখানেই ব্যক্তিগত জীবন ও জাতীয় ইতিহাস নীরবে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
বাড়িটি ধ্বংস হওয়া শুধু ইট-পাথরের ক্ষতি ছিল না। এটি ছিল স্মৃতির বিনাশ। বুলডোজার দিয়ে ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা। কিন্তু শাসনব্যবস্থা ভবন ভাঙতে পারে, পারিবারিক সম্পর্কের অনুভূতি ভাঙতে পারে না। বাড়িটি নেই। কিন্তু তার প্রতীকী অর্থ রয়ে গেছে।
বহু জেলার মানুষ :
ঢাকার বাইরে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল তারেক রহমানের পরিচয় গঠনে ভূমিকা রেখেছে। তার মাতামহ-মাতামহী দিনাজপুরে বাস করতেন। বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম জলপাইগুড়িতে এবং তিনি দিনাজপুরে বেড়ে ওঠেন। তবে, বেগম জিয়ার পৈতৃক শিকড় ফেনিতে। এসব স্থান থেকে তারেক রহমান গ্রামীণ জীবনের গল্প, পারিবারিক বন্ধন এবং গভীর সামাজিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
পিতৃপক্ষের শিকড় জিয়াউর রহমানের নিজ জেলা বগুড়ায়। বগুড়া প্রতীক হয়ে উঠেছিল বিনয়, তৃণমূলের সংযোগ এবং দৃঢ়তার। এখান থেকে তারেক রহমান শিখেছেন কেবল রাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, মাটির সঙ্গে যুক্ত থাকার অর্থ।
বিবাহ এবং নতুন অন্তর্ভুক্তি :
ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে তার বিবাহ সিলেটকে তারেক রহমানের আবেগিক ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত করে, যা রাজনীতির মাধ্যমে নয়, পরিবারের বন্ধনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
প্রবাসী ঐতিহ্য, শিক্ষা এবং শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য সুপরিচিত সিলেট তাকে কেবল জাতীয় নেতা হিসেবে গ্রহণ করেনি, তাকে নিজেদের একজন হিসেবে মেনে নিয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় সিলেট সফরের সময় জনতা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান দেয়নি। বরং শোনা গেছে ‘দুলা ভাই, দুলা ভাই’ ধ্বনি। সিলেটি সংস্কৃতিতে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এটি স্নেহ, পরিচিতি এবং আস্থার প্রকাশ।
আরো তাৎপর্যপূর্ণ হলো অনেক সিলেটবাসী তাকে দামান (সিলেটি ভাষায় জামাই) হিসেবে উল্লেখ করেন। দামান বলে ডাকা মানে প্রতীকীভাবে পরিবারে স্বাগত জানানো। এটি দলীয় সীমা, ব্যালট ও ব্যানারের ঊর্ধ্বে গ্রহণযোগ্যতার প্রকাশ।
সিলেটবাসীর কাছে তারেক রহমান কেবল সফরকারী রাজনীতিক বা দূরবর্তী ক্ষমতাধর নন। তিনি বিবাহসূত্রে যুক্ত, অভিন্ন রীতিনীতির অংশ, আবেগিক নৈকট্যে সংযুক্ত একজন মানুষ। এই সম্পর্ক নির্বাচনী সমর্থনের চেয়েও গভীর— এটি অন্তরঙ্গতা, স্বীকৃতি এবং অন্তর্ভুক্তির প্রতিফলন।
যে দেশে রাজনীতি প্রায়শই বিভাজনে চিহ্নিত, সেখানে এই বন্ধন আলাদা করে নজরে আসে। এটি দেখায়- ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক সম্মান এবং মানবিক সংযোগ কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয়কে গড়ে তুলতে পারে— যা কোনো নির্বাচনী স্লোগান দিয়ে সম্ভব নয়।
সিলেটের জন্য, তারেক রহমান শুধু একজন নেতা নন। তিনি তাদের দুলা ভাই। তিনি তাদের দামান এবং বাংলাদেশে এই ধরনের গ্রহণযোগ্যতার অর্থ এমন, যা কোনো উপাধি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
প্রতিটি স্থান তাকে কিছু না কিছু দিয়েছে:
● ঢাকা তাকে দিয়েছে ইতিহাস ও দায়িত্ব
● চট্টগ্রাম তাকে দিয়েছে সংগ্রামের প্রাথমিক বোধ
● দিনাজপুর ও ফেনী তাকে দিয়েছে পারিবারিক শিকড়
● বগুড়া তাকে দিয়েছে বিনয় ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ
● সিলেট তাকে দিয়েছে ধারাবাহিকতা ও অংশীদারিত্ব
এই সব স্থান মিলেই তার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে।
নির্বাসন, উচ্ছেদ ও ক্ষতি:
২০০৮ সালে রাজনৈতিক নিপীড়নের ভারে তারেক রহমান বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। দুই বছর পর ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে, তার মা শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ হন।
পুলিশ দরজা ভেঙে ফেলে। খালেদা জিয়াকে হয়রানি করা হয়। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সামগ্রী পর্যন্ত নিতে পারেননি। পুরো জাতি দেখেছে, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েছেন।
যে আঙিনায় একসময় তারেক রহমান ফুটবল খেলেছেন, সেটি আজ অপরিচিত। কিন্তু স্মৃতি টিকে থাকার জন্য দেয়ালের প্রয়োজন হয় না।
ফিরে আসা :
তরুণ রাজনীতিক হিসেবে দেশ ছাড়ার ১৭ বছর পর তারেক রহমান নির্বাসন, ক্ষতি ও প্রত্যাশার ভার বহন করে অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে ফিরে আসেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতা হিসেবে তিনি শুধু রাজনৈতিক পরিসর পুনরুদ্ধার করতে নয়, বরং একটি দেশের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হতে ফিরে আসেন— যে দেশ তাকে খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছে।
কেন এই স্থানগুলো গুরুত্বপূর্ণ:
তারেক রহমানের জন্য বাড়ি একটি ভবন নয়। এটি স্থান, মানুষ এবং স্মৃতির একটি মোজাইক।
বাংলাদেশ তাকে আবার গ্রহণ করেছে— অতীত ভুলে যাওয়া নয়, বরং সবকিছু মনে রেখেই।
এখন যে দেশ তাঁকে গড়ে তুলেছে, সেই দেশ অপেক্ষা করছে— দেখার জন্য, বহু ‘বাড়ি’র অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা মানুষটি কি তাদের সবার উপযুক্ত একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারেন কি না।