শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮:২৪, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২১:২৮, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি (চিরির বন্দরের একটি রাস্তা)। ছবি: সংগৃহীত।
বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি (বিএসডিএ) শনিবারে ‘দিনাজপুরে পারিবারিক জীবনযাত্রায় কোভিড-১৯ এর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বাস্থ্যগত প্রভাবের মূল্যায়ন’ শীর্ষক একটি বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জনস্বাস্থ্য উপদেষ্টা এএএম মাহবুবুল হক কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এই প্রতিবেদনে গ্রামীণ চিরিরবন্দর এবং শহরতলী দিনাজপুর সদরের ৭০০টি পরিবারের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে চিকিৎসা ক্ষেত্রে উচ্চ সফলতা থাকলেও চলমান অর্থনৈতিক দুর্বলতার এক চরম বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে।
মূল পর্যবেক্ষণ: পুনরুদ্ধারের স্ববিরোধিতা
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে কাজের সুযোগ বাড়লেও খাদ্য নিরাপত্তার অভাব কাটেনি। যদিও শতভাগ পরিবারের প্রধান পূর্ণকালীন কাজে ফিরেছেন, তবুও প্রায় ৮৯.৫ শতাংশ পরিবার এখনো পর্যায়ক্রমিক খাদ্য অনিরাপত্তার সম্মুখীন হচ্ছে। এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ঋণের বিশাল বোঝা; মহামারীর চরম সময়ে টিকে থাকতে প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার বেসরকারি সংস্থা বা ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করেছিল, যেখানে মাত্র ২ শতাংশ পরিবার সরকারি সহায়তা পেয়েছিল।
আর্থিক বিপর্যয়: মহামারীর সময় ৮৯ শতাংশ পরিবারের আয় নাটকীয়ভাবে কমে সর্বনিম্ন স্তরে (১০,০০০ টাকার নিচে) নেমে গিয়েছিল।
শিক্ষা সংকট: এই অঞ্চলে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। অনলাইন অবকাঠামোর অপ্রতুলতার কারণে ৯৩.৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
স্বাস্থ্য ও টিকাদান: ক্লিনিকাল স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সফলতা ছিল অনেক বেশি। জরিপকৃতদের মধ্যে ৯৯.৫ শতাংশই টিকার আওতায় এসেছেন এবং কারো মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যায়নি। তবে ৯৭ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে, এই সেবাগুলো পেতে তাদের চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি
এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, এই প্রতিবেদনে কমিউনিটির অসাধারণ সহনশীলতার চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রায় ৯৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে, তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক অপরিবর্তিত রয়েছে। এছাড়া ৯৮ শতাংশ মানুষ আত্মবিশ্বাসী যে, উৎসব এবং অনুষ্ঠানগুলো মহামারীর আগের অবস্থায় ফিরে আসায় তাদের স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যসমূহ সংরক্ষিত থাকবে।
লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের আহ্বান
ভবিষ্যতের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই প্রতিবেদনে সর্বসম্মতভাবে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার দাবি জানানো হয়েছে। মূল সুপারিশগুলো হলো:
১. ঋণ মুক্তি: পরিবারগুলোকে বেসরকারি ঋণের ফাঁদ থেকে বাঁচাতে স্বল্প সুদে জরুরি ঋণের ব্যবস্থা করা। ২. ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি: শিক্ষার ব্যবধান ঘোচাতে ডিজিটাল লার্নিং রিকভারি প্রোগ্রাম বা অনলাইন শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম চালু করা। ৩. দক্ষতার বহুমুখীকরণ: অকৃষি খাতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান, কারণ ৮৮.৫ শতাংশ পরিবার এখন নতুন কারিগরি দক্ষতা শিখতে আগ্রহী। ৪. স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি: দূরবর্তী গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছানোর জন্য মোবাইল এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা।
এএএম মাহবুবুল হক উল্লেখ করেন, "দিনাজপুরের চিকিৎসা সংক্রান্ত সক্ষমতা শক্তিশালী ছিল, কিন্তু আর্থ-সামাজিক পুনরুদ্ধারের বিষয়টি এখনও নাজুক। শিক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি এবং ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা দূর করাই এখন আমাদের দীর্ঘমেয়াদী অগ্রাধিকার।"
বিএসডিএ (BSDA) সম্পর্কে
বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি (বিএসডিএ) একটি অলাভজনক, বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা। ১৯৯৬ সালে জনাব আবদুস সালাম কয়েকজন উৎসাহী তরুণ, শিক্ষক এবং সমাজকর্মীদের নিয়ে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। দিনাজপুরে অবস্থিত এই সংস্থাটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবেশ, মানবাধিকার এবং ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ করে আসছে।