শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪:১২, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: ডিডাব্লিউ-এর সৌজন্যে।
হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ-এর মতে, ২০২৫ সালটি এমন একটি ‘সন্ধিক্ষণ’ (tipping point) হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যার ফলে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সংস্থাটি গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি জার্মানির মতো দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকেও ইঙ্গিত করেছে, খবর ডিডাব্লিউ-এর।
প্রতিবেদনের প্রধান দিকসমূহ:
স্বৈরাচারী শাসনের উত্থান: বুধবার নিউইয়র্ক ভিত্তিক এই সংস্থাটি জানায়, ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরা বিশ্বের স্বৈরাচারী শাসকদের আরও সাহসী করে তুলেছে, যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সংখ্যালঘু ও অরক্ষিত জনগোষ্ঠীকে।
বিপন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা: এইচআরডাব্লিউ-এর নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বোলোপিয়ন লিখেছেন, "বৈশ্বিক মানবাধিকার ব্যবস্থা আজ বিপন্ন। একদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিরবচ্ছিন্ন চাপ, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার ক্রমাগত বাধার মুখে নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের মুখে।"
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভগুলোর ওপর আঘাত হানছে এবং বর্ণবাদী বক্তব্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
ইউক্রেন ও গাজা পরিস্থিতি
প্রতিবেদনটিতে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করা হয়নি, বরং রাশিয়া ও ইসরায়েলের ভূমিকার ওপরও তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে:
ইউক্রেন: রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচারে বোমা হামলা, বন্দিদের নির্যাতন এবং ইউক্রেনীয় শিশুদের অপহরণ করে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন এসব বিষয়কে ছোট করে দেখছে।
গাজা: মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর (IDF) বিরুদ্ধে গাজায় "গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ" করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার জবাবে ইসরায়েল যে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে, তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে সংস্থাটি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ২০২৬ সালের জন্য যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তা মূলত বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকোচন এবং মানবাধিকারের ওপর ক্রমবর্ধমান আঘাতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এইচআরডাব্লিউ-এর নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বোলোপিয়নের মতে, ২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হলেও এর প্রভাব হবে বিশ্বব্যাপী।
২০২৬ সালের জন্য এইচআরডাব্লিউ-এর পূর্বাভাস
গণতান্ত্রিক রক্ষাকবচের অবক্ষয়: সংস্থাটি আশঙ্কা করছে যে, ২০২৬ সালে স্বাধীন আদালত, মুক্ত গণমাধ্যম এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আক্রমণ আরও তীব্র হবে। যখন এই গণতান্ত্রিক সুরক্ষাগুলো ভেঙে পড়ে, তখন মানবাধিকার লঙ্ঘন করা সহজ হয়ে যায়।
বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী প্রবণতা: ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত বিভিন্ন নীতি বিশ্বজুড়ে অন্যান্য স্বৈরাচারী নেতাদের উৎসাহিত করবে। এইচআরডাব্লিউ মনে করে, ২০২৬ সালে অনেক দেশেই "শক্তির জোরেই মুক্তি" (might makes right) — এই নীতি কার্যকর হতে দেখা যাবে।
মানবাধিকার জোটের প্রয়োজনীয়তা: সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সালে মানবাধিকার রক্ষা করতে হলে কেবল পুরনো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং মানবাধিকারকামী দেশগুলোকে একটি শক্তিশালী "কৌশলগত জোট" (Strategic Alliance) গড়ে তুলতে হবে, যা পরাশক্তিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
করপোরেট ও বৈশ্বিক প্রভাব: এইচআরডাব্লিউ সতর্ক করেছে যে, ২০২৬ সালে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। তারা কি কেবল "নিয়ন্ত্রণমূলক ঝুঁকি" হিসেবে মানবাধিকারকে দেখবে, নাকি নৈতিক অবস্থান নেবে—তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
শরণার্থী ও অভিবাসন সংকট: অভিবাসীদের সুরক্ষা এবং আশ্রয়ের অধিকার ২০২৬ সালে আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কেবল যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বরং ইউরোপের রাজনীতিতেও (যেমন জার্মানিতে মের্জ সরকারের অধীনে) প্রভাব ফেলবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ২০২৬ সালের প্রতিবেদনটি (World Report 2026) কেবল উদ্বেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ফিলিপ বোলোপিয়নের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির মোকাবিলায় একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।
ফিলিপ বোলোপিয়ন বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি "প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, স্বৈরাচারী ঢেউ রুখে দিতে এবং মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
"স্বৈরাচারী ঢেউকে থামানো এবং মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো আমাদের এই প্রজন্মের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ" — ফিলিপ বোলোপিয়ন
তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে, এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে ভোটার, সুশীল সমাজ, বহুপাক্ষিক সংস্থা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে একটি নির্ধারিত, কৌশলগত এবং সুশৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে।
সংক্ষেপে ২০২৬ সালের মূল বার্তা
বোলোপিয়ন ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে, ২০২৬ সালে বিশ্বের পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে দৃশ্যমান হলেও, তার ফলাফল হবে বিশ্বব্যাপী সুদূরপ্রসারী। মানবাধিকার রক্ষার জন্য কেবল পরাশক্তিদের ওপর নির্ভর না করে, মধ্যম শক্তিগুলোকে (Middle Powers) ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।