ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

২ মাঘ ১৪৩২, ২৬ রজব ১৪৪৭

শিরোনাম

Scroll
পত্রিকা: ’রাতের ভোটে লেনদেন ১০ হাজার কোটি’
Scroll
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসন ভিসার কাজ স্থগিত করলো যুক্তরাষ্ট্র
Scroll
২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী আছে চট্টগ্রামে
Scroll
যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা
Scroll
আইন না থাকার কারণেই কি কমছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা?
Scroll
জাপানে উচ্চ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ অফুরন্ত: জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত
Scroll
তারেক রহমানের সঙ্গে ১২ দলীয় জোট ও সমমনা জোট নেতাদের সাক্ষাৎ
Scroll
রাষ্ট্রপতির সাথে প্রধান বিচারপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ
Scroll
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪৪০ বাংলাদেশি বন্দিকে রাজকীয় ক্ষমা
Scroll
বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উন্নতি হয়েছে: বিশ্বব্যাংক
Scroll
মনোনয়ন গ্রহণ, বাতিল: ইসিতে পঞ্চম দিনে আরো ৭৩ আপিল মঞ্জুর
Scroll
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে তরুণরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পাবে: আলী রীয়াজ
Scroll
দেশের ক্রান্তিলগ্নে বিএনসিসি ক্যাডেটদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: সেনা প্রধান
Scroll
শুল্ক বাধা সত্ত্বেও চীনের রেকর্ড ১ ট্রিলিয়ন ডলার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত
Scroll
স্বর্ণের দামে আবারও নতুন রেকর্ড, রুপার দাম ৯০ ডলারে পৌঁছেছে
Scroll
থাইল্যান্ডে ট্রেনের ওপর ক্রেন পড়ায় ২২ জনের প্রাণহানি, আহত ৩০
Scroll
নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই হবে: মার্কিন কূটনীতিকদের প্রধান উপদেষ্টা
Scroll
শিপিং কর্পোরেশনকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা
Scroll
সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট লাইসেন্স বিধিমালা জারি করেছে এনবিআর
Scroll
নির্বাচনে ভুয়া তথ্য মোকাবেলায় জাতিসংঘের সহায়তা চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা

নেপাল প্রথম মৎস্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করল

বাসস

প্রকাশ: ২২:০০, ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২২:০৫, ১০ জানুয়ারি ২০২৬

নেপাল প্রথম মৎস্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করল

কর্ণালী নদী, নেপাল। ছবি: সংগৃহীত।

নেপালের নিম্নাঞ্চলীয় কর্ণালী নদীতে দেশটির প্রথম মৎস্য অভয়ারণ্য ঘোষিত হয়েছে। স্বাদু পানির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে রাজাপুর এবং টিকাপুর পৌরসভা যৌথভাবে গত বৃহস্পতিবার এই সংরক্ষিত এলাকার ঘোষণা দেয়। 'সখী মৎস্য অভয়ারণ্য' নামে অভিহিত এই উদ্যোগটি নেপালের প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত এবং স্থানীয় সরকার পরিচালিত মৎস্য সংরক্ষণ অঞ্চল।

এর মূল লক্ষ্য হলো নদীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল রক্ষা করা এবং টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, রিপোর্ট করেছে দ্য হিমালয়ান টাইম্স। 

এই অভয়ারণ্যটি নিম্নাঞ্চলীয় কর্ণালী নদীর প্রায় ৩.৯ বর্গকিলোমিটার (৩৯০ হেক্টর) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটি রাজাপুর-৩ এর দক্ষিণ তেধিয়া এবং রাজাপুর-৪ এর ছেদিয়া থেকে শুরু করে টিকাপুর-৮ এর আরনাহাওয়া ফাট্টা পর্যন্ত উভয় পৌরসভার নদী সংলগ্ন অংশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

চিহ্নিত এই অঞ্চলটি পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত, যা দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রধান প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এছাড়া এই এলাকাটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রাণী যেমন গাঙ্গেয় ডলফিন, ঘড়িয়াল এবং মসৃণ লোমযুক্ত উদবিড়ালের (otter) জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় আবাসস্থল। স্থানীয় নেতাদের মতে, মাত্রাতিরিক্ত মাছ ধরা, আবাসস্থল ধ্বংস এবং দূষণের কারণে মাছের সংখ্যা ও জলজ জীববৈচিত্র্যের যে দ্রুত অবনতি ঘটছে, তা রোধ করতেই এই অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়েছে।

টিকাপুর পৌরসভার মেয়র রাম লাল ডাঙ্গৌরা থারু বলেন, এই অভয়ারণ্যটি রাজাপুর ও টিকাপুর পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত। এটি তৃণমূল পর্যায় থেকে নদী-নির্ভর জনগোষ্ঠীর মতামতের ভিত্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় দায়িত্বশীলতার বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, রাজাপুর পৌরসভার মেয়র দীপেশ থারু জানান, এই যৌথ ঘোষণাটি নদীর দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রতীক। নিম্নাঞ্চলীয় কর্ণালী রক্ষা করাকে তারা এখন থেকে নিজেদের অভিন্ন দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করছেন।
মেয়র আরও বলেন, "এটি স্থানীয় সরকার, জনপদ এবং সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী নদী পরিচালনার একটি সূচনা।" এই মৎস্য অভয়ারণ্যটি স্থানীয় জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ঘোষণা করা হয়েছে। পৌর কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত এবং 'অবাধ, পূর্ববর্তী ও অবহিত সম্মতি' (FPIC) নীতি অনুসরণ করে ওয়ার্ড পর্যায়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যেহেতু মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়, তাই মাছের বংশবৃদ্ধির সময়ে মৌসুমি বিধিনিষেধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে যাতে মাছের সংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। তবে নিষিদ্ধ সময় বাদে অন্য সময়ে মাছ ধরার জন্য পারমিট বা অনুমতির প্রয়োজন হবে। অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী, 'সখী মৎস্য অভয়ারণ্য' একটি সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে, যেখানে পৌরসভার নেতৃত্বের সাথে নদী-নির্ভর জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে। নিয়মিত তদারকি, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং টেকসই মৎস্য শিকার নিশ্চিত করতে স্থানীয় বন বিভাগ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে 'কমিউনিটি রিভার স্ট্রেচ ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ' গঠন করা হয়েছে।

বিশেষ করে সোনাহা এবং থারু সম্প্রদায়ের অর্থবহ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ তাদের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য কর্ণালী অববাহিকার নদী ও মাছের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ঘোষণাটি ডব্লিউডব্লিউএফ (WWF) নেপাল এবং স্থানীয় সহযোগীদের দীর্ঘদিনের কাজের ফসল। উদবিড়াল সংরক্ষণ এবং নদীর টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ডব্লিউডব্লিউএফ নেপাল স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করে আসছে। তারা মৌসুমি বিধিনিষেধ মেনে চলা, বড় ছিদ্রযুক্ত জালের ব্যবহার এবং বিকল্প জীবিকা তৈরির মাধ্যমে মাছের ওপর চাপ কমানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

এই সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলাফল ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। জীবিকা বৈচিত্র্যায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ মাছ ধরার ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে এনেছেন। যেমন, বর্দিয়ার গেরুয়া এলাকার সুধা চৌধুরীর পরিবার এখন বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু করেছেন এবং গত বছর মরিচ চাষ করে ৫০,০০০ রুপি আয় করেছেন। অন্যান্যরা নদীর পাড়ে রেস্তোরাঁ খোলা, মাছ চাষ সমবায় সমিতি গঠন বা উদ্ভিদ-ভিত্তিক হস্তশিল্পের কাজ শুরু করেছেন। এর ফলে বন্য মাছের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি স্থানীয়দের জন্য টেকসই আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে।
৬০ বছর বয়সী মাইতি থারুনি, যিনি রাজাপুরের ১৮ জন নারী কারিগরের একজন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও বাজার সুবিধা পেয়ে উৎসাহিত হয়ে বলেন, "এখন আমরা হস্তশিল্প তৈরিতে এতই ব্যস্ত থাকি যে মাছ ধরার সময় পাই না।" এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নদীর স্বাস্থ্য এবং বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য 'কমিউনিটি মনিটরিং গ্রুপ' বা সামাজিক পর্যবেক্ষণ দল গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে এই দলগুলো 'মসৃণ লোমযুক্ত উদবিড়াল' (smooth-coated otter) পর্যবেক্ষণ করছে, যা আইইউসিএন (IUCN) রেড লিস্টে অন্তর্ভুক্ত এবং পশ্চিম কর্ণালী অঞ্চলে বর্তমানে বিরল হয়ে পড়েছে।

এই ঘোষণাটি স্থানীয় সরকার, জনপদ, সরকারি সংস্থা এবং সুশীল সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। ডারউইন ইনিশিয়েটিভের অধীনে যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে এবং ডব্লিউডব্লিউএফ (WWF) নেপালের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় "কর্ণালীতে উদবিড়াল সংরক্ষণে জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও দায়িত্বশীলতা শক্তিশালীকরণ" প্রকল্পের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে। প্রকল্পটি নেপাল সরকার এবং স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থা যেমন সোনাহা বিকাশ সমাজ, মুক্ত কামাইয়া নারী উন্নয়ন ফোরাম, ডলফিন সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং স্মল ম্যামালস কনজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ডব্লিউডব্লিউএফ নেপালের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ঘনশ্যাম গুরুং বলেন, এই অভয়ারণ্যটি স্বাদু পানির প্রাণী সংরক্ষণে একটি জাতীয় মডেল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। তিনি আরও বলেন, "স্থানীয় পৌরসভাগুলো যে মালিকানা গ্রহণ করেছে এবং এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহসী নেতৃত্ব দেখিয়েছে, তার জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই অঞ্চলে মাছ কেবল জীবিকার উৎস নয়, বরং এখানকার সংস্কৃতি ও ধর্মের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।"

তিনি আরও যোগ করেন যে, ঘড়িয়াল, উদবিড়াল এবং ডলফিনের মতো আইকনিক বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করার মাধ্যমে এই উদ্যোগটি প্রকৃতি-নির্ভর পুনরুৎপাদনশীল পর্যটন শিল্পকেও শক্তিশালী করবে। তার ভাষায়, "যখন আমরা মাছ রক্ষা করি, তখন আমরা পানি রক্ষা করি; যখন পানি রক্ষা করি, তখন জীবন রক্ষা করি; আর যখন জীবন রক্ষা করি, তখন আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করি।" প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, নিম্ন কর্ণালী নদীর এই মৎস্য অভয়ারণ্য নেপালের জীববৈচিত্র্য রক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা তৈরিতে একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

সম্পর্কিত বিষয়:

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন