শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭:৫২, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৫৩, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
বিশ্বের ইতিহাসে এ যাবৎকালের বৃহত্তম বাণিজ্য উদ্বৃত্তের ঘোষণা দিয়েছে চীন, যার পরিমাণ ১.১৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ছবি: সংগৃহীত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক এবং বাণিজ্য নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করলেও ২০২৫ সালে রেকর্ড রপ্তানি আয়ের কথা জানিয়েছে চীন।
বুধবার বেইজিং বিশ্বের ইতিহাসে এ যাবৎকালের বৃহত্তম বাণিজ্য উদ্বৃত্তের (আমদানির তুলনায় পণ্য ও সেবা রপ্তানির পরিমাণ) ঘোষণা দিয়েছে, যার পরিমাণ ১.১৯ ট্রিলিয়ন ডলার (£৮৯০ বিলিয়ন), খবর বিবিসি’র।
এটিই প্রথমবার যখন চীনের বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ালো, যা ২০২৪ সালের ৯৯৩ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
গত বছর সাতবার চীনের মাসিক রপ্তানি উদ্বৃত্ত ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে—যা প্রমাণ করে যে ট্রাম্পের শুল্ক অভিযান বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সাথে চীনের সামগ্রিক বাণিজ্যে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বাণিজ্য কিছুটা কমলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে চীন সেই ঘাটতি পূরণ করেছে।
চীনের কাস্টমস বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর ওয়াং জুন বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের "গভীর পরিবর্তন" এবং চ্যালেঞ্জের মুখে এই অর্জন "অসাধারণ এবং অত্যন্ত কষ্টার্জিত"। তিনি গ্রিন টেকনোলজি বা সবুজ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংশ্লিষ্ট পণ্য এবং রোবোটিক্স রপ্তানি বৃদ্ধির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
দক্ষিণ এশীয় দেশসহ আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী বৈশ্বিক চাহিদার কারণে এই বিশাল উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল কিছুটা দুর্বল। আবাসন সংকট এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের কারণে চীনের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে দ্বিধাবোধ করছে এবং সাধারণ মানুষ খরচ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছে।
ফলে পণ্য আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে এবং নতুন তথ্য অনুযায়ী আমদানি বেড়েছে মাত্র ০.৫%। একই সাথে ইউয়ানের মান কমে যাওয়া, পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির কারণে চীনের রপ্তানি পণ্যগুলো বিদেশের বাজারে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
হিনরিচ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষক ডেবোরা এলমস এই ফলাফলকে বেইজিংয়ের জন্য "মিশ্র আশীর্বাদ" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, চীন বিদেশে পণ্য বিক্রি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে উপকৃত হলেও, তাদের পণ্যগুলো এখন বিদেশি বাজারগুলোতে আরও "কঠোর নজরদারির" মুখে পড়তে পারে, কারণ ওইসব বাজার এখন চীনের পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চাপে রয়েছে।
এলমস জানান, বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চীনা পণ্য ও সেবা আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালেও চীনের এই সাফল্য বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বেইজিংয়ের কাছে একটি স্পষ্ট সংকেত যে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিশ্বের সর্বত্র চীনের বিশাল গ্রাহকগোষ্ঠী রয়েছে। তবে ওয়াং সতর্ক করেছেন যে, চীন বর্তমানে একটি অনিশ্চিত বৈদেশিক পরিস্থিতির মুখোমুখি। বেশ কিছু দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, তাদের বাজার চীনের সস্তা পণ্যে ছেয়ে যাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় পণ্যগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরেকটি অস্থির বছর এবং শুল্ক নিয়ে উত্তেজনার আশঙ্কা করছে।
গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প ৯০টিরও বেশি দেশের পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে কঠোর শুল্কগুলো ছিল চীনের জন্য, কারণ চীন অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে।
বিশ্বের বৃহত্তম এই দুই অর্থনীতির মধ্যে বাড়তে থাকা বাকযুদ্ধ এক পর্যায়ে তিন অঙ্কের (শতকরা ১০০ ভাগ বা তার বেশি) সামগ্রিক শুল্ক আরোপের হুমকিতে রূপ নেয়। তৎকালীন সময়ে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে মার্কিন বাজারের ওপর চীনের নির্ভরশীলতার একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখেছিলেন। যদিও বেইজিং জোর দিয়ে বলেছিল যে, চীনা ব্যবসায়ীদের পণ্য বিক্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলো বাজারের মধ্যে একটি মাত্র।
অবশেষে গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প এবং চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি বৈঠকের পর উভয় পক্ষ বৈরিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে সক্ষম হয়, যা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করে।
তবে, অন্যান্য মাঝারি মাত্রার শুল্কগুলো এখনো বহাল রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।