শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪:৪৯, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৫:০১, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফকোভিচ চীনের বিষয়টি মাথায় রেখে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ (MFN) নীতিটি পুনঃমূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পর থেকে চীনের রপ্তানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চীনের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে। এমন অবস্থায় কমিশন এখন ডব্লিউটিও-র সেই নিয়মটি পর্যালোচনা করতে চায়, যা সদস্যদের বাধ্য করে কোনো এক অংশীদারকে দেওয়া সর্বনিম্ন শুল্ক সুবিধা অন্য সব সদস্যকেও দিতে হয়। বিশ্ব বাণিজ্য বিধিতে এটিই ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ নীতি হিসেবে পরিচিত, খবর ইউরো নিউজের।
এই মর্যাদাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি কয়েক দশক ধরে বিশ্ব বাণিজ্যকে প্রভাবিত করেছে। এর ফলে চীন একটি উদীয়মান বাজার থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উন্নত অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার পরও নিম্ন শুল্কের সুবিধা ভোগ করতে পেরেছে।
নতুন এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্রাসেলস এখন নিম্ন শুল্ক সুবিধাকে পারস্পরিক বাজার সুবিধার সাথে যুক্ত করতে চায়। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো চীনে ক্রমাগত বাধার সম্মুখীন হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্পর্ক পুনর্ভারসাম্য করার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও চীন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বের সাথে তার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি করে চলেছে।
সাইপ্রাসে ইইউ বাণিজ্য মন্ত্রীদের বৈঠকের পর শুক্রবার সেফকোভিচ বলেন, নিম্ন শুল্কের সুবিধা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের বাজারেও সমান প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। আমি মনে করি উভয় পক্ষেই ন্যায্যতা থাকা জরুরি।
চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে
আগামী মার্চ মাসে ক্যামেরুনে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে এই বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে। এর ঠিক এক বছর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যা বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল এবং পরবর্তীতে আদালত কর্তৃক বাতিল করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—উভয় দেশের ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী বাণিজ্য নীতির কারণে সৃষ্ট ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলনে ডব্লিউটিও-র সংস্কারের বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে।
মূলত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য রোধ করার জন্য ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ (MFN) নিয়মটি তৈরি করা হয়েছিল। তবে ব্রাসেলস এখন মনে করছে যে, এই নিয়মটি চীনের সঙ্গে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
সেফকোভিচ বলেন, যখন এই নীতিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন এবং ডব্লিউটিও-র চর্চায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তখন বিশ্ব পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। সে সময় বৈশ্বিক জিডিপিতে চীনের অবদান ছিল প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ, যা বর্তমানে ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৩৫৯.৩ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।
সমালোচকরা দীর্ঘকাল ধরে দাবি করে আসছেন যে, ২০০১ সালে ডব্লিউটিও-তে যোগদানের পর থেকে বেইজিং এর নিয়মকানুন পুরোপুরি মেনে চলেনি। বিশেষ করে চীনের সরকারি ভর্তুকির বিষয়টি এখানে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যেই চীনের অর্থনীতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, যার সামনে রয়েছে কেবল যুক্তরাষ্ট্র।
গত শুক্রবার কমিশনার সেফকোভিচ বলেন, গত তিন দশকে বিশ্ব বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কিছু ডব্লিউটিও সদস্য দেশ বিশ্ব বাণিজ্যে তাদের অংশীদারিত্ব নাটকীয়ভাবে বাড়ালেও নিজেদের বাজার তুলনামূলকভাবে বন্ধ রেখেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং বাজার-বহির্ভূত নীতিগুলোর প্রসার ঘটেছে।
‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ (MFN) নিয়মটি আমেরিকার নেওয়া বিভিন্ন চুক্তির কারণেও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গত বছর আমেরিকা তার বাণিজ্য অংশীদারদের সাথে শুল্ক বৃদ্ধির ভয় দেখিয়ে বেশ কিছু চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
গত জুলাই মাসে সম্পাদিত ইইউ-আমেরিকা চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন পণ্য আমদানিতে ইইউ শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে আমেরিকার পক্ষ থেকে ইইউ পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা করা এসব বাণিজ্য চুক্তি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) নোটিফাই বা অবহিত করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তিগুলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করার সুযোগ দিতে সদস্যদের তা অবহিত করা বাধ্যতামূলক।
সাম্প্রতিক এক বড় ঘটনায়, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আদালতের মতে, জরুরি অবস্থার আইন প্রয়োগ করে প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। এই রায় বর্তমানে অত্যন্ত জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সংক্ষেপে পরিস্থিতি (২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী):
সুপ্রিম কোর্টের রায়: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট একটি ৬-৩ ভোটে রায় দিয়েছে যে, 'ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট' (IEEPA) ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ করার কোনো আইনি ক্ষমতা নেই। শুল্ক আরোপের ক্ষমতা শুধুমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ: এই রায়ের পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি দমে যাচ্ছেন না। বরং তিনি এখন 'ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪'-এর ১২২ এবং ৩০১ ধারা ব্যবহার করে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছেন।
বাজারের ওপর প্রভাব: এই আইনি লড়াই ও শুল্কের অস্থিরতা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, যা ইইউসহ অন্যান্য অংশীদারদের জন্য বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখা আরও কঠিন করে তুলেছে।