শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২২:০০, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
মার্চের ৩১ তারিখ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বহুল প্রতীক্ষিত সফরে চীন যাচ্ছেন। বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির দেশের নেতাদের এই বৈঠকের খবর এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ট্রাম্পের আরোপিত ব্যাপক শুল্ক (ট্যারিফ) বাতিল করে দিয়েছে।
২০ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এই সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ঠিক তার আগেই দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধের অংশ হিসেবে নেওয়া অনেকগুলো শুল্ক নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে তাকে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের ওপর আরোপিত কিছু শুল্কও অন্তর্ভুক্ত ছিল, খবর সিঙ্গাপুর স্ট্রেইটস টাইমসের।।
ধারণা করা হচ্ছিল, বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এই দীর্ঘ বৈঠকে মূল আলোচনা হবে বিদ্যমান বাণিজ্য যুদ্ধ বিরতির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে, যাতে নতুন করে শুল্ক বৃদ্ধি এড়ানো যায়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও বেইজিংয়ের কাছ থেকে ফেন্টানিল পাচার রোধ এবং খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ স্থগিতের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক কিছুটা কমিয়েছিলেন, যার ফলে সম্পর্ক সম্প্রতি কিছুটা স্থিতিশীল ছিল।
আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, 'ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট'-এর অপব্যবহার করে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর যে ২০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিলেন, তা তার ক্ষমতার বহির্ভূত ছিল। ফেন্টানিল বিতরণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি সংক্রান্ত জাতীয় জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। তবে সেকশন ৩০১ এবং সেকশন ২৩২ আইনের অধীনে আরোপিত অন্যান্য শুল্কগুলো এখনও বহাল রয়েছে।
ট্রাম্প ঠিক কতগুলো শুল্ক পুনরায় কার্যকর করবেন তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট না হলেও, এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন যে তিনি ১৫০ দিনের জন্য বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করবেন।
২০১৭ সালের পর এটিই হবে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন সফররত বিদেশি নেতাদের ট্রাম্প এই সফর সম্পর্কে বলেন, "এটি একটি অভাবনীয় সফর হতে যাচ্ছে। আমাদের চীনের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা প্রদর্শনী করতে হবে।"
রয়টার্স প্রথম এই সফরের তারিখগুলো প্রকাশ করলেও ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীন দূতাবাস এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকেও সফরের বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে যে, বাণিজ্য ঘাটতির কারণে সৃষ্ট জাতীয় জরুরি অবস্থা মার্কিন উৎপাদন শিল্পকে দুর্বল করে দিচ্ছে, আর তা মোকাবিলা করতেই এই বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করা প্রয়োজন ছিল।
ওয়াশিংটনের ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর চীন বিষয়ক অর্থনীতিবিদ ড. স্কট কেনেডি বলেন, বেইজিং তাদের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার যে হুমকি দিয়েছিল, তার কার্যকরিতার কারণে ট্রাম্প আগে থেকেই বাণিজ্য যুদ্ধে কিছুটা ‘রক্ষণাত্মক’ অবস্থানে ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টে শুল্ক সংক্রান্ত এই পরাজয় সম্ভবত চীনের চোখে ট্রাম্পের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে। কেনেডির মতে, চীনা কর্মকর্তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান গতিপথ পছন্দ করছেন যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কিছুটা খর্ব হচ্ছে, এবং তারা চান না যে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠুক।
গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় দুই নেতার সাক্ষাতের পর এটিই হবে তাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক। সেই বৈঠকেই তারা বাণিজ্য যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়েছিলেন।
অক্টোবরের বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুটি এড়িয়ে যাওয়া হলেও, চলতি মাসে দুই নেতার ফোনালাপের সময় শি জিনপিং তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি উত্থাপন করেন।
চীন গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে, যা তাইপেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। আইনত তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার উপায় সরবরাহ করতে বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও তাইওয়ানের সাথে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখে এবং দ্বীপটির সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের জন্য তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়, যার মূল্য ছিল ১১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাইওয়ান ভবিষ্যতে এমন আরও অস্ত্র ক্রয়ের আশা করছে।
ট্রাম্পের দেওয়া তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারির সেই ফোনালাপে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি আরও বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, সংকটে থাকা মার্কিন কৃষকরা ট্রাম্পের একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি, আর চীন হলো বিশ্বের শীর্ষ সয়াবিন আমদানিকারক।
বিশ্লেষকরা ২০ ফেব্রুয়ারি জানান যে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর চীন হয়তো সয়াবিন কেনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে আগের মতো আগ্রহী হবে না। যদিও ট্রাম্প কানাডা থেকে গ্রিনল্যান্ড এবং ভেনেজুয়েলা পর্যন্ত তার কঠোর নীতিগুলোকে চীনকে ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করে আসছিলেন, তবুও গত কয়েক মাসে তিনি শুল্ক থেকে শুরু করে উন্নত কম্পিউটার চিপ এবং ড্রোনের মতো ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের প্রতি নমনীয়তা দেখিয়েছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প যে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা তার মিত্রসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, ঢালাওভাবে সব দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় বেইজিং আসলে এই শুল্কের আঘাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেয়েছে এবং চীন থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা (supply chain) সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে।
পিটারসন ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস-এর সিনিয়র ফেলো মার্টিন চোরজেম্পা বলেন, এই রায়ের ফলে অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ওপর কার্যকর শুল্কের হার যদি চীনের তুলনায় বেশি কমে যায়, তবে তা পরোক্ষভাবে বেইজিংয়ের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।
চোরজেম্পা আরও যোগ করেন, "অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় চীনের ওপর আরোপিত অধিকাংশ শুল্কের ক্ষেত্রে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং আইনগতভাবে অনেক বেশি টেকসই প্রক্রিয়া রয়েছে, যার ফলে অন্য দেশের তুলনায় চীন এই রায়ে কম প্রভাবিত হতে পারে।"