শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৮:২৯, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, মাঝখানে, ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেইন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তার। সংগৃহীত ছবি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক চাপে পিষ্ট হয়ে ভারত এখন দূরবর্তী দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্ব খুঁজছে। কানাডা এবং অন্যান্য মধ্যম শক্তির (middle powers) দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীর করতে ভারত এখন মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তির প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের অনীহা কাটিয়ে উঠছে।
সুইজারল্যান্ডের দাভোস-এ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যখন বিশ্বব্যবস্থায় একটি "বিরাট ফাটল" ধরার ঘোষণা দিয়ে বলেন যে, টিকে থাকতে হলে "মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে", তখন তিনি যেন নাম না করেই ভারতকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নয়াদিল্লিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাহী প্রধান উরসুলা ফন ডার লিয়েন-এর সাথে দাঁড়িয়ে "সব চুক্তির সেরা চুক্তি" (mother of all deals) ঘোষণা করেন। এটি এমন এক বাণিজ্য চুক্তি—যার মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত—যা নিয়ে উভয় পক্ষ গত ২০ বছর ধরে হিমশিম খাচ্ছিল, খবর দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার।
চুক্তির মূল দিকসমূহ:
বিশাল বাজার: এই বাণিজ্য চুক্তিটি ২০০ কোটি মানুষের এক বিশাল বাজারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
বাণিজ্য বৃদ্ধি: লক্ষ্য হলো আগামী ছয় বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করা।
নতুন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক: আমেরিকার প্রভাব-পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংগত করতে এই নতুন আন্তর্জাতিক মৈত্রী তৈরি করা হচ্ছে।
'মধ্যম শক্তি' হিসেবে ভারত:
ভারত কোনো ছোট দেশ নয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বিন্যাসে এটি একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক "মধ্যম শক্তি" হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে এটি বিশ্বের বৃহত্তম জনবহুল দেশ। মাথাপিছু আয় জাপান বা জার্মানির তুলনায় অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও, ভারতের অর্থনীতি বিশ্বের শীর্ষ পাঁচের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।
সাম্প্রতিক তৎপরতা:
অন্যান্য মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সাথে ভারতের এই তৎপরতা শুরু হয়েছিল গত বছর ব্রিটেনের সাথে দীর্ঘদিনের আটকে থাকা মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে। এরপর গত ডিসেম্বরে ওমান এবং নিউজিল্যান্ডের সাথেও চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো ভারতের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে মোদীর 'আত্মনির্ভরশীলতা' (self-reliance) অর্জনের প্রচেষ্টা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে, অন্য দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিকভাবে না জড়িয়ে ভারত নিজেকে সবচেয়ে ভালো রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা এবং অন্যান্য দেশগুলো এখন বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে যে, পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্ক গভীর করার মধ্যেই আসল শক্তি নিহিত।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জার্মানি, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের নেতারা নয়াদিল্লি সফর করেছেন এবং প্রত্যেকেই ভারতের সাথে সম্পর্ক মজবুত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন চুক্তি প্রস্তাব করেছেন। এমনকি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও ফেব্রুয়ারিতে ভারত সফরে আসছেন।
তালিকার পরবর্তী নাম মার্ক কার্নি। আশা করা হচ্ছে, আগামী মার্চ মাসে তিনি একটি কানাডীয় প্রতিনিধি দল নিয়ে দিল্লিতে আসবেন এবং আরেকটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করবেন।
ট্রাম্পের শুল্ক এবং ভারতের অবস্থান
দাভোস-এ কার্নির বক্তৃতায় ট্রাম্প প্রশাসনের নাম উল্লেখ করা না হলেও, আন্তর্জাতিক শুল্ক নীতির কারণে পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা যে ভেঙে পড়ছে, তা ভারত খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প ভারত থেকে আমদানিকৃত বেশিরভাগ পণ্যের ওপর মোট ৫০% শুল্ক আরোপ করেছিলেন—যার অর্ধেক ছিল 'পারস্পরিক' শুল্ক এবং বাকি অর্ধেক ছিল রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য আকস্মিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
গত ২৫ বছরের মার্কিন-ভারত কূটনীতির মূল লক্ষ্য ছিল চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করা। ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো তানভি মদনের মতে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে সরাসরি চীনের বিরোধিতা করতে দ্বিধাবোধ করত। কারণ ভারত চেয়েছিল:
চীনের মেধা ও প্রযুক্তি নিজেদের কাজে লাগানো (যেমনটি চীন একসময় পশ্চিমের সাথে করেছিল)।
প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী হয়ে সরাসরি চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করা।
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের চ্যালেঞ্জ
চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোকে চাপে ফেলার ক্ষেত্রে ভারত একটি বড় অসুবিধার সম্মুখীন। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (global supply chain) ভারতের হাতে এমন কোনো 'চোক পয়েন্ট' (choke point) বা নিয়ন্ত্রণ নেই, যা অন্যদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন:
চীন: বিরল খনিজ পদার্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
তাইওয়ান ও নেদারল্যান্ডস: উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
চীন বনাম ভারত: নতুন বন্ধুত্বের প্রয়োজন
একদিকে বিশ্ববাজারে সস্তা চীনা পণ্যের প্লাবন, অন্যদিকে হিমালয় সীমান্তে ভারতীয় ভূখণ্ডে চীনা সেনাদের অনুপ্রবেশ—সব মিলিয়ে ভারতের এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন। যদি সেই বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র না হয়, তবে অন্য দেশগুলোকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে।
কানাডার সাথে সম্পর্কের মোড়
কানাডার সাথে এই নতুন চুক্তি হবে একটি অভাবনীয় পরিবর্তন। কারণ ২০২৪ সালের অক্টোবরেও ভ্যাঙ্কুভারের কাছে একজন শিখ কর্মীর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারত ও কানাডা একে অপরের কূটনীতিকদের বহিষ্কার করেছিল। চরম তিক্ততা কাটিয়ে এই বাণিজ্যিক পুনর্মিলন সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২৫ সালের জুন মাসে আলবার্টা (Alberta)-তে অনুষ্ঠিত জি-৭ (G-7) সম্মেলনে কার্নির আমন্ত্রণে মোদীর যোগদান ছিল ভারত-কানাডা সম্পর্কের বরফ গলার শুরু। এর ঠিক পরেই আমেরিকার আরোপিত শুল্কের ধাক্কা ভারতকে তার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
ভারত দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই সম্পর্কগুলো ভারতের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত অর্থবহ হয়ে উঠেছে। ইওয়াই ইন্ডিয়া (EY India)-এর প্রধান নীতি উপদেষ্টা ডি.কে. শ্রীবাস্তবের মতে, বড় অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে ভারত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমাতে সক্ষম হবে।