শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯:৪৮, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
সম্প্রতি সোনার দাম রেকর্ড সর্বোচ্চে পৌঁছেছে, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয়স্থল সম্পদে অর্থ জমা করছেন।
সোমবার প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫,০০০ ডলার (£৩,৬৪৬) ছাড়িয়ে যায় এবং কিছুক্ষণের জন্য ৫,৫০০ ডলারে পৌঁছে যায়। রূপা এবং প্ল্যাটিনামের দামও একই রকম বৃদ্ধি পেয়েছে, খবর বিবিসি’র।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর থেকে সবকটিরই তীব্র পতন ঘটেছে, যদিও গত বছরের তুলনায় এই সময়ের চেয়ে অনেক বেশি রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ পরিবর্তন করছে
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি ও অনিশ্চয়তা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত বিভিন্ন ট্যারিফ বা শুল্ক নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে বিরোধ এবং নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকিতে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজারের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে তারা স্বর্ণকে বেছে নেওয়ায় এর দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ: ইউক্রেন এবং গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে এক ধরণের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এছাড়া ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আটকের ঘটনা স্বর্ণের দামকে রেকর্ড পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যখনই বিশ্বে যুদ্ধ বা বড় কোনো রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দেয়, বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ কিনে নিজেদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে চান।
মার্কিন ডলারের দরপতন: ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। বিশেষ করে ‘লিবারেশন ডে’ ট্যারিফ ঘোষণার পর ডলারের মান বড় ধরণের ধাক্কা খায়। সাধারণত ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়, যা এবারও ঘটেছে।
দাম কমার একটি কারণ
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষণ: যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু ইতিবাচক সংকেত দেখা দেওয়ায় স্বর্ণের দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় কমে আসায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ের (স্বর্ণ) বদলে পুনরায় অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করছেন, ফলে স্বর্ণ, রূপা ও প্লাটিনামের দাম হঠাৎ করে পড়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণ ও রূপার দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ার পর গত কয়েক দিনে তা দ্রুত কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এগুলো হলো: মুনাফা তুলে নেওয়া (Profit-Taking): জানুয়ারির শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম যখন প্রতি আউন্স $৫,৫০০ এবং রূপা $১২০ ছাড়িয়ে যায়, তখন অনেক বিনিয়োগকারী তাদের কেনা ধাতু বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেন। এই ব্যাপক বিক্রির চাপ বাজারে দাম কমিয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Fed) নিয়ে গুঞ্জন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ারশ (Kevin Warsh)-কে মনোনীত করতে পারেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। ওয়ারশ কঠোর মুদ্রা নীতি বা উচ্চ সুদের হারের পক্ষে বলে পরিচিত। সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের বদলে বন্ড বা সুদে অর্থ রাখা লাভজনক মনে করেন, ফলে স্বর্ণের চাহিদা কমে যায়।
ডলারের শক্তিশালী হওয়া: গত কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের মান পুনরায় বাড়তে শুরু করেছে। স্বর্ণ ও রূপার দাম সাধারণত ডলারের বিপরীতে ওঠানামা করে। ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, যা চাহিদাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাজারের অতি-প্রতিক্রিয়া ও সংশোধন: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জানুয়ারির শুরুর দিকে স্বর্ণ ও রূপার দাম যেভাবে অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছিল (Parabolic Move), তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ছিল না। দাম যখন কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আকাশচুম্বী হয়, তখন একটি বড় ধরণের দরপতন বা 'মার্কেট কারেকশন' ঘটা স্বাভাবিক।
ভুয়া খবর ও অ্যালগরিদমিক ট্রেডিং: গত ২৮ জানুয়ারি কিছু গণমাধ্যমে মার্কিন সরকারের স্ট্র্যাটেজিক মেটাল সাপোর্ট বন্ধ করার একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়। কিন্তু তার আগেই স্বয়ংক্রিয় ট্রেডিং সিস্টেম বা অ্যালগরিদমগুলো ব্যাপক হারে বিক্রি শুরু করে, যা রূপার দামে বড় ধরণের ধস নামায়।
স্বর্ণ ও রূপার দাম কমার প্রধান কারণ
সবচেয়ে বড় কারণ হলো ফেডারেল রিজার্ভের (Fed) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ারশ (Kevin Warsh)-এর মনোনয়ন। বিষয়টি যেভাবে বাজারকে প্রভাবিত করেছে:
মুদ্রাস্ফীতি দমনে কঠোর অবস্থান: কেভিন ওয়ারশ একজন 'মনিটারি হক' (Monetary Hawk) হিসেবে পরিচিত, অর্থাৎ তিনি সাধারণত উচ্চ সুদের হার এবং মুদ্রাস্ফীতি দমনের পক্ষে। বিনিয়োগকারীরা আগে ভয় পাচ্ছিলেন যে, ট্রাম্প এমন কাউকে নিয়োগ দেবেন যিনি তার চাপে পড়ে সুদের হার অনেক কমিয়ে দেবেন (যার ফলে ডলারের মান কমে যেত এবং স্বর্ণের দাম বেড়ে যেত)। কিন্তু ওয়ারশ-এর মতো অভিজ্ঞ এবং তুলনামূলক স্বাধীন একজনকে বেছে নেওয়ায় সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে।
ডলারের শক্তিশালী হওয়া: ওয়ারশ-এর মনোনয়নের খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের মান শক্তিশালী হয়েছে। যেহেতু স্বর্ণ ও রূপা ডলারে কেনাবেচা হয়, তাই ডলার শক্তিশালী হলে অন্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য এই ধাতুগুলো কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, যা চাহিদা কমিয়ে দেয়।
বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়া: স্বর্ণের দাম যখন প্রতি আউন্স $৫,৫০০ এবং রূপা $১২০-এর রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, তখন অনেক বিনিয়োগকারী তাদের লাভ নিশ্চিত করতে সম্পদ বিক্রি শুরু করেন। এই ব্যাপক বিক্রির চাপও দাম দ্রুত কমিয়ে দিয়েছে।
দাম এখনো কেন গত বছরের তুলনায় বেশি?
দাম কমলেও তা গত বছরের এই সময়ের চেয়ে অনেক বেশি থাকার কারণগুলো হলো:
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: ইউক্রেন এবং গাজা অঞ্চলের যুদ্ধ এখনো বিদ্যমান, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা বজায় রেখেছে।
ট্রাম্পের ট্যারিফ বা শুল্ক নীতি: বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি ডলারের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে এখনো সংশয় তৈরি করে রেখেছে।
নিরাপদ আশ্রয় (Safe Haven): অনিশ্চিত পৃথিবীতে স্বর্ণকে এখনো সবচেয়ে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এটি কোনো কোম্পানি বা দেশের ঋণের ওপর নির্ভরশীল নয়।