ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

২ মাঘ ১৪৩২, ২৬ রজব ১৪৪৭

শিরোনাম

Scroll
পত্রিকা: ’রাতের ভোটে লেনদেন ১০ হাজার কোটি’
Scroll
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসন ভিসার কাজ স্থগিত করলো যুক্তরাষ্ট্র
Scroll
২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী আছে চট্টগ্রামে
Scroll
যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা
Scroll
আইন না থাকার কারণেই কি কমছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা?
Scroll
জাপানে উচ্চ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ অফুরন্ত: জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত
Scroll
তারেক রহমানের সঙ্গে ১২ দলীয় জোট ও সমমনা জোট নেতাদের সাক্ষাৎ
Scroll
রাষ্ট্রপতির সাথে প্রধান বিচারপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ
Scroll
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪৪০ বাংলাদেশি বন্দিকে রাজকীয় ক্ষমা
Scroll
বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উন্নতি হয়েছে: বিশ্বব্যাংক
Scroll
মনোনয়ন গ্রহণ, বাতিল: ইসিতে পঞ্চম দিনে আরো ৭৩ আপিল মঞ্জুর
Scroll
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে তরুণরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পাবে: আলী রীয়াজ
Scroll
দেশের ক্রান্তিলগ্নে বিএনসিসি ক্যাডেটদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: সেনা প্রধান
Scroll
শুল্ক বাধা সত্ত্বেও চীনের রেকর্ড ১ ট্রিলিয়ন ডলার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত
Scroll
স্বর্ণের দামে আবারও নতুন রেকর্ড, রুপার দাম ৯০ ডলারে পৌঁছেছে
Scroll
থাইল্যান্ডে ট্রেনের ওপর ক্রেন পড়ায় ২২ জনের প্রাণহানি, আহত ৩০
Scroll
নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই হবে: মার্কিন কূটনীতিকদের প্রধান উপদেষ্টা
Scroll
শিপিং কর্পোরেশনকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা
Scroll
সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট লাইসেন্স বিধিমালা জারি করেছে এনবিআর
Scroll
নির্বাচনে ভুয়া তথ্য মোকাবেলায় জাতিসংঘের সহায়তা চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা

কী! কী কইলি! আমি মোটা! বিলুফুপি আমাদের দিকে তেড়ে আসে

শব্দদূষণ (ছোট গল্প)

মনির জামান

প্রকাশ: ১২:০৮, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১২:১১, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

শব্দদূষণ (ছোট গল্প)

ছবি: জেমিনাই-এর সৌজন্যে।

আশির দশকের কথা। শহরে খুব আন্দোলন চলতেছিলো; ককটেল ফুটতেছিলো থেকে থেকে। ক্লাস টিচার বললো—এবার সামরিক সরকার বিদায় হবেই হবে; যা, তোরা বাড়ি যা গিয়া…।

আমরা হৈচৈ করতে করতে স্কুল থেকে বেরিয়ে দেখি, গাড়িঘোড়া নাই; দোকান পাট বন্ধ। গাব্বু বলে—চল, এই সুযোগে মেইনরোডে ফুটবল খেলি।

বেশিক্ষণ খেলা হয় না। পুলিশের গাড়ি বাঁক খেয়ে গলির মুখে এসে দাঁড়ায়। আমরা উর্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে মহল্লায় ঢুকে নূরু কাকার দোকানের সামনে এসে দেখি, বিলু ফুপি গুলতানি মারতেছে। আমাদেরকে দেখে ফস করে একটা ব্যানসন ধরিয়ে চৌকিদারকে বলে—ফার্মের মুরগি খাইয়া এযুগের মাইয়াগুলা ক্যামন ধুমসী হয়া যাইতাছে! এগো কেডা বিয়া করবো!

বিলুফুপির কথা শুনে আমরা ফিক ফিক করে হাসি। রিপন বলে—বুঝছি, এর লাইগাই তোমার বিয়া হইতাছে না।

কী! কী কইলি! আমি মোটা! বিলুফুপি আমাদের দিকে তেড়ে আসে। আমরা বলি—না, ফুপি; তোমার স্বাস্থ্য ভালো; একদম নাদুস-নুদুস। কি সুন্দর দেবীদের মত টানাটানা চোখ তোমার! টর্চ লাইটের মত জ্বলতে থাকে…।

পাম্প পেয়ে বিলুফুপি গলে যায়। সিগারেটে পাফ দিয়ে বলে—কি খাবি তোরা? রুটি, কলা? যা মন চায় খা।

আমরা যখন কলা, রুটি খাচ্ছিলাম, তখনি বিকট শব্দ তুলে গলির মুখে অনেকগুলো ককটেল ফোটে। মনে হচ্ছিলো, বোমাগুলো যেনো আমাদের গায়ে এসে পড়তেছে। বিলু ফুপির বোমার শব্দে পাশে আছড়ে পড়ে যায়। আমরা নিলডাউন হয়ে দোকানের সামনে বসে পড়ি। শব্দ থেমে গেলেও আমাদের কানে ঝিঁঝিঁ ডাকতে থাকে। তাকিয়ে দেখি, বিলু ফুপি কাৎ হয়ে পড়ে থেকে খুব গোঙ্গাচ্ছে; আর নাক-মুখ দিয়ে গ্যাজা বেরুচ্ছে! আমরা হামলে পড়ি। বিলুফুপির মাথায় জল ঢেলে দিই। ফুপি তবু সহজ হয় না। অবস্থা বেগতিক দেখে এম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতেলে নিয়ে যাই।

কিন্তু হায়, পরীক্ষা করে ডাক্তার বলে—শি ইজ নো মোর!

আমরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি।

জ্বলজ্জ্যান্ত মানুষ ককটেলের শব্দে গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে মরে গেলো—এ ছিলো আশ্চার্য ঘটনা আমাদের স্কুলজীবনের। আমরা মিনুমামাকে খুঁজি; কোথাও পাই না। বড়রা বলে—ওকে পাবি না; ও গেছে আন্দোলন করতে; এরশাদরে গদি থিকা নামাইয়া ছাড়বো। বোনটা যে মরছে, সেই খবর লওয়ার টাইম আছে ওর!

মিনু, ঝিনু, বিলু—তিন ভাইবোন। ওদের আরেক বোন আজিজ মহল্লার গাব্বুর মা। গাব্বু মামা ডাকে, তাই আমরাও বলি ‘মিনুমামা’—টারজানের মতো লম্বা ছিপছিপে, ঘাড় পর্যন্ত সিল্কি চুল; শহরের সেরা দৌঁড়বিদ; প্রেসিডেন্ট ম্যাডেল পাওয়া;বোন বলতে পাগল।

সন্ধ্যায় যখন ফুপিকে কবরে নামিয়ে দিই, তখনো গুরুর দেখা পাই না। ইয়া মোটা দারোগা চাচা, যার নাম ঝিনু—বোনের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের মতো করে কেঁদে উঠলে আমরাও ডুকরে উঠি। বড়রা বলে—কান্দিস না, ঝিনু; কান্দলে মুর্দার আজাব হয়…।

দারোগা চাচা কান্না থামিয়ে চিৎকার করে ওঠে—এই শহরে কারা ককটেল ফুটায়! সবগুলার পশ্চাৎদেশে ককটেল ঢুকামু…। বলতে বলতে পেটমোটা দাপুটে লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে!

এমন মৃত্যু দেখে রাতে আমাদের ঘুম হয় না।বিলু ফুপি রাগি ছিলো বটে, আমাদের কতোনা আদর করতো। পরদিন স্কুলে যাওয়ার পথে ফুল দিবো বলে কবরস্থানে গিয়ে দেখি, মিনুমামা দাঁড়িয়ে আছে। মাথার হ্যাটটা বোনের কবরের উপর রাখা। আমরা ওনার পিছে গিয়ে দাঁড়াই। প্রার্থনা শেষ করে আমাদেরকে বলে—এ শহর আর বাসযোগ্য নাই; আমি চলে যাচ্ছি; তোদের সঙ্গে আর দেখা হবে না…।

আমরা হৈচৈ করে উঠি—কোথায় যাবা তুমি?

যে শহরে বোন মরে যায়, সে শহরে কি করে থাকি!

মিনুমামা আমাদের দিকে একনজর তাকিয়ে রিক্সায় উঠে হ্যাটটা মাথায় দিয়ে সেই যে চলে গেলো—তারপর আন্দোলন শেষ হয়ে গনতন্ত্র আসে; আমরা কলেজে উঠে যাই—গুরুর আর কোনো হদিস পাই না। দারোগা চাচা বাসায় ভাড়াটিয়া উঠিয়ে দিয়ে সরকারি কোয়ার্টারে চলে যায়। আমরাও ভুলে যাই বিলুফুপির আশ্চর্য মৃত্যুর ঘটনা।

জানালায় দাঁড়ালে কখনো চোখে পড়ে বিলুফুপির এলসেশিয়ান কুকুরটাকে; অনাদরে, বয়সের ভারে গলির কোথাও কুন্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। কিন্ত বড় হয়ে গেছি বলে মনের মধ্যে আবেগ আসে না। এমন এক শ্রাবন দুপুরে দরজায় বেল বাজে। গিয়ে দেখি—কুরিয়ারের হাতে বিদেশি টিকেট লাগানো একখানা খাম। খুলে দেখি লেখা—‘তোরা সবাই ভালো আছিস? ঠিকঠাক কানে শুনিস তো? এদেশে শব্দদুষণ নাই।‘—সুইডিশ মিনু।

চিঠিটা পড়ে লহমায় ছেলেবেলা মনে পড়ে যায়—দু’চোখে অশ্রু গড়ায়; কে কোথায় কখন যে হারায় বোঝা যায় না...।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন