ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১:৫৬, ১২ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: কাঠমান্ডু পোস্টের সৌজন্যে।
এক মাসের মধ্যে চতুর্থ দফায় দাম বৃদ্ধির ফলে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ২১৯ রুপিতে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা আরও দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
জ্বালানির দাম আর কতদিন বাড়বে? তা এখনও অনিশ্চিত। জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা আকাশচুম্বী হবে? কারও কাছে এর স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই, খবর কাঠমান্ডু পোস্টের ।
সারা নেপালের সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান জ্বালানির দামের কারণে তীব্র চাপের মুখে পড়ছেন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে মুদিপণ্য, রেস্তোরাঁ এবং দৈনন্দিন গৃহস্থালি ব্যয়ের মতো প্রায় প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়ছে।
নেপাল গত শুক্রবার এক মাসের মধ্যে চতুর্থবারের মতো জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে, যা তাদের পেট্রোলিয়াম পণ্যকে আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের মধ্যে সবচেয়ে দামি করে তুলেছে। সংশোধিত হার অনুযায়ী, কাঠমান্ডুতে এখন প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ২১৯ রুপি (১.৪৮ ডলার) এবং ডিজেলের দাম ২০৭ রুপি (১.৪০ ডলার)।
বারবার দাম বাড়ানো সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নেপাল অয়েল কর্পোরেশন বলছে যে তারা এখনও বড় ধরনের লোকসানের মুখে রয়েছে—প্রতি পাক্ষিকে (১৫ দিনে) প্রায় ৫ কোটি ২৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়ানো অনিবার্য হতে পারে।
আঞ্চলিক তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নেপালের জ্বালানি তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ। পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (প্রতি লিটার ১.৩৬ ডলার), তবে সেখানে প্রিমিয়াম ডিজেলের দাম সবচেয়ে বেশি (প্রতি লিটার ১.৮৬ ডলার)। নয়াদিল্লিতে পেট্রোলের দাম প্রতি লিটার ১.০২ ডলার এবং ডিজেল ০.৯৫ ডলার। শ্রীলঙ্কায় পেট্রোল ১.৩০ ডলার এবং ডিজেল ১.২১ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। ভুটানে পেট্রোল ও ডিজেল উভয়ের দামই ১.০৬ ডলার, আর মালদ্বীপে পেট্রোল ১.০৪ ডলার এবং ডিজেল ১.১৪ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশে তেলের দাম সবচেয়ে কম, যেখানে পেট্রোল ০.৮৭ ডলার এবং ডিজেল ০.৭৬ ডলার প্রতি লিটার।
নেপাল অয়েল কর্পোরেশন জানিয়েছে যে, রেকর্ড দাম বৃদ্ধি এবং শুল্ক ও অবকাঠামো কর ৫০ শতাংশ কমানোর পরেও তারা প্রতি পাক্ষিকে ৭.৮১ বিলিয়ন রুপির বেশি লোকসান দিচ্ছে। এছাড়া নেপালের একমাত্র জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের কাছে কর্পোরেশনের পাওনা প্রায় ১৮ বিলিয়ন রুপি। তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে আভাস পাওয়া গেছে যে, আগামী দিনগুলোতে দাম আরও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কর্পোরেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর মনোজ কুমার ঠাকুর বলেন, কর্তৃপক্ষ জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য যানবাহনের ক্ষেত্রে জোড়-বেজোড় (odd-even) নিয়ম চালুর প্রস্তাব করেছে। জ্বালানি খরচ কমাতে সরকার ইতিমধ্যে সরকারি অফিস, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শনি ও রবিবার—দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি চালু করেছে।
ঠাকুর আরও বলেন, “আমরা সপ্তাহে চার দিন কর্মদিবসের পরামর্শও দিয়েছিলাম।”
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গত শুক্রবার সতর্ক করে দিয়েছে যে, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে জ্বালানি, পরিবহন, খাদ্য এবং সেবার খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে অগ্রগতি সত্ত্বেও নেপাল আমদানিকৃত পেট্রোলিয়ামের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি বাহ্যিক ধাক্কার মুখে পড়ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি ৩.৭ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী বছরে এটি আরও বেড়ে ৪.৫ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে।
তেল কর্পোরেশনকে সচল রাখতে এবং পাওনা পরিশোধে সহায়তার জন্য সরকার জ্বালানির ওপর আমদানি শুল্ক ও অবকাঠামো কর অর্ধেক করলেও সাধারণ ভোক্তারা এর কোনো সুফল পাননি।
ভোক্তা অধিকার কর্মীদের মতে, সরকার জনগণের উদ্বেগগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ন্যাশনাল কনজিউমার ফোরামের প্রেসিডেন্ট প্রেম লাল মহারজন বলেন, “জ্বালানির উচ্চমূল্য ইতিমধ্যে ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। কর্পোরেশনকে মনে হচ্ছে কেবল তাদের লোকসান গণনা করতেই ব্যস্ত। সাধারণ মানুষের অভিযোগ কে শুনবে?”
এক সপ্তাহের জ্বালানি মজুদ থাকা সত্ত্বেও প্রতি সপ্তাহে দাম বাড়ানোর জন্য তিনি কর্পোরেশনের সমালোচনা করেন। তিনি এই চর্চাকে অযৌক্তিক এবং জনস্বার্থ বিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও বলেন, “সরকারও এই কাজে সমর্থন দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”
জ্বালানির দাম বাড়ার বিরূপ প্রভাব ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাতে অনুভূত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, যেসব শিল্প ডিজেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ২০০ রুপি ছাড়িয়ে যাওয়ায় সেগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
সর্বশেষ দাম বৃদ্ধির পর, পরিবহন ব্যবস্থাপনা বিভাগ আন্তঃপ্রদেশ রুটে যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া ১৬.৭১ শতাংশ বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে। পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে—তরাই রুটে ১৫.৭৫ শতাংশ এবং পাহাড়ি রুটে ২১.৬৮ শতাংশ।
কাঠমান্ডু উপত্যকা অন্তর্ভুক্ত বাগমতি প্রদেশ এখনও তাদের পরিবহন ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করেনি।
এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে। ২৫ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা চালের দাম ইতিমধ্যে ১০০ থেকে ২০০ রুপি পর্যন্ত বেড়েছে এবং শাকসবজির দামও চড়া। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, দুগ্ধজাত পণ্য এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম শীঘ্রই বাড়তে পারে। গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক্সসহ খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে।
ভোক্তা অধিকার কর্মীদের দাবি, জ্বালানির দাম মাত্র ৫ শতাংশ বাড়লে নিত্যপণ্যের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যা সাধারণ পরিবারের ওপর ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
অর্থনীতিবিদ চন্দ্র মণি অধিকারী বলেন, সরকার যদি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তবে জ্বালানি আমদানির ওপর কর আরও কমাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার জ্বালানি কর অর্ধেক করার পর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় আবারও দাম বাড়িয়েছে, যা নীতিগত অসামঞ্জস্যতা প্রকাশ করে।
অধিকারী বলেন, “নেপালে পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম এখন আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের মধ্যে সর্বোচ্চ। উচ্চ জ্বালানি খরচ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীর করে দেয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ব্যাহত করে।”
তিনি ভোক্তাদের বোঝা কমাতে এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখতে কৌশলগত হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ভোক্তা অধিকার কর্মীরা সরকারকে সরবরাহ চেইনের অদক্ষতা, বিশেষ করে খাদ্য ও সবজির বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ন্যাশনাল কনজিউমার ফোরাম দাম স্থিতিশীল করার জন্য র্যাপিড রেসপন্স টিম মোতায়েনের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।