ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

২ মাঘ ১৪৩২, ২৬ রজব ১৪৪৭

শিরোনাম

Scroll
পত্রিকা: ’রাতের ভোটে লেনদেন ১০ হাজার কোটি’
Scroll
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসন ভিসার কাজ স্থগিত করলো যুক্তরাষ্ট্র
Scroll
২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী আছে চট্টগ্রামে
Scroll
যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা
Scroll
আইন না থাকার কারণেই কি কমছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা?
Scroll
জাপানে উচ্চ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ অফুরন্ত: জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত
Scroll
তারেক রহমানের সঙ্গে ১২ দলীয় জোট ও সমমনা জোট নেতাদের সাক্ষাৎ
Scroll
রাষ্ট্রপতির সাথে প্রধান বিচারপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ
Scroll
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪৪০ বাংলাদেশি বন্দিকে রাজকীয় ক্ষমা
Scroll
বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উন্নতি হয়েছে: বিশ্বব্যাংক
Scroll
মনোনয়ন গ্রহণ, বাতিল: ইসিতে পঞ্চম দিনে আরো ৭৩ আপিল মঞ্জুর
Scroll
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে তরুণরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পাবে: আলী রীয়াজ
Scroll
দেশের ক্রান্তিলগ্নে বিএনসিসি ক্যাডেটদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: সেনা প্রধান
Scroll
শুল্ক বাধা সত্ত্বেও চীনের রেকর্ড ১ ট্রিলিয়ন ডলার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত
Scroll
স্বর্ণের দামে আবারও নতুন রেকর্ড, রুপার দাম ৯০ ডলারে পৌঁছেছে
Scroll
থাইল্যান্ডে ট্রেনের ওপর ক্রেন পড়ায় ২২ জনের প্রাণহানি, আহত ৩০
Scroll
নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই হবে: মার্কিন কূটনীতিকদের প্রধান উপদেষ্টা
Scroll
শিপিং কর্পোরেশনকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা
Scroll
সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট লাইসেন্স বিধিমালা জারি করেছে এনবিআর
Scroll
নির্বাচনে ভুয়া তথ্য মোকাবেলায় জাতিসংঘের সহায়তা চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা

বিপুল সাম্রাজ্য জয় করলেও

কেন ভারতের সীমান্ত থেকে ফিরে যান চেঙ্গিস খান

রেহান ফজল, বিবিসি হিন্দি’র সৌজন্যে

প্রকাশ: ০৯:৫৮, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

কেন ভারতের সীমান্ত থেকে ফিরে যান চেঙ্গিস খান

প্রতীকি ইমেজ। সংগৃহীত।

প্রায় ৮০০ বছর আগে, কৃষ্ণ সাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মঙ্গোল যাযাবর। তার নাম ছিল তেমুজিন, যিনি সারা বিশ্বের কাছে চেঙ্গিস খান নামে পরিচিত।

১১৬২ সালে বৈকাল হ্রদের পূর্বে অবস্থিত দুর্গম এলাকায় একজন সাহসী যাযাবরের পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার।

'দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি অফ দ্য মঙ্গোলস'-বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, জন্মের সময় লক্ষ্য করা গিয়েছিল হাতের তালুতে রক্ত জমাট বাঁধা রয়েছে। বিষয়টাকে ভবিষ্যতের একজন মহান বিজয়ীর লক্ষণ হিসেবে মনে করেছিলেন অনেকে।

নামের কারণে অনেকে তাকে মুসলিম বলে মনে করলেও খান ছিল সম্মানসূচক উপাধি। আসলে তিনি মঙ্গোল। শামানিক ধর্মে বিশ্বাস করতেন তিনি, যেখানে মহাজাগতিক শক্তিতে বিশ্বাস করা হয়।

তার শিশুকালটা সহজ ছিল না। বিষ প্রয়োগ করে তার বাবাকে হত্যা করেছিল শত্রুরা। খুব অল্প বয়সেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন চেঙ্গিস খান।

অবহেলা ও দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে তার জীবনের প্রথম অংশ। কিন্তু ৫০ বছর বয়সে পৌঁছে চেঙ্গিস খান জয়ের যে ধারা তৈরি করেন, তা তাকে পৌঁছে দিয়েছিল বিশ্বের মহান যোদ্ধাদের তালিকায়।

তারই নেতৃত্বে মঙ্গোল রাজবংশের আবির্ভাব হয় যা সমগ্র চীন, মধ্য এশিয়া, ইরান, পূর্ব ইউরোপ এবং রাশিয়ার একটা বড় অংশকে শাসন করে।

চেঙ্গিস খানের সৈন্যবাহিনী অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, ভিয়েতনাম, বার্মা, জাপান এমনকি ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।

মঙ্গোলদের নিয়ে এফ ই ক্রাউসের বইয়ে লেখা হয়েছে, "চেঙ্গিসের সাম্রাজ্য এক কোটি ২০ লাখ বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত ছিল, যা আয়তনের দিক থেকে আফ্রিকা মহাদেশের সমান এবং উত্তর আমেরিকা মহাদেশের চেয়েও বড়। তুলনামূলকভাবে রোমান সাম্রাজ্য খুবই ছোট ছিল।"

প্রসঙ্গত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে আলেকজান্ডারের কাছে তার বাবা ফিলিপের তৈরি বিশাল সেনাবাহিনী ছিল। জুলিয়াস সিজারের কাছে ছিল ৩০০ বছরের পুরোনো সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ঐতিহ্য। ফরাসী বিপ্লবের পর জনপ্রিয়তার উপর ভিত্তি করা সমর্থনের কারণে শাসন করতে পেরেছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।

অন্যদিকে, চেঙ্গিস খানকে নিজের ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সঙ্গে লড়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি যা মোটেই সহজ কাজ ছিল না।

সৎভাইকে হত্যা
তরুণ বয়সে বাজপাখির সঙ্গে অন্যান্য পাখি মারার কৌশল শিখতে শুরু করেন তিনি। ভবিষ্যতে নেতা হয়ে ওঠার জন্য সেই সময় একে একটা অপরিহার্য গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। চেঙ্গিস খান কখনো লেখাপড়া শেখেননি।

১৩ বছর বয়সে তিনি তার সৎ ভাই বেহতেরকে হত্যা করেন।

ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকলিন তার বই 'চেঙ্গিস খান: দ্য ম্যান হু কনকার্ড দ্য ওয়ার্ল্ড' বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন, "এত অল্প বয়সে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে চেঙ্গিস খানের মধ্যে সহজাত নিষ্ঠুরতা ছিল। কিশোর বয়সেই ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা গড়ে তুলেছিলেন তিনি।"

"বেহতেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন তিনি। কারণ জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে তার (বেহতের) বেশি দাবি ছিল।"

ধীরে ধীরে, একজন তরুণ সৈনিক হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেন চেঙ্গিস খান এবং তার প্রায় পুরো জীবনই কেটেছে তাঁবুতে বা যুদ্ধের ময়দানে। প্রশাসনের দিকে নজর দেওয়ার জন্য তার কাছে সময় ছিল না।"

ইরানি ইতিহাসবিদ মিনহাজ আল-সিরাজ জুজ্জানি তার সম্পর্কে লিখেছেন, "একজন দুর্দান্ত ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন চেঙ্গিস, যিনি তার সেনাবাহিনীকে দেবতার মতো নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যে সময় তিনি খারসানে উপস্থিত হন, তখন তার বয়স ছিল ৬৫ বছর।"

"লম্বা ও মজবুত কাঠামো ছিল তার। মুখে উপর এসে পড়া সামান্য কয়েকগোছা চুলে ততদিনে পাক ধরেছে। তার চোখ ছিল মার্জারের মতো, শরীরে ছিল প্রচণ্ড শক্তি। শত্রুদের প্রতি তার চেয়ে নির্মম আর কেউ হতে পারে না।"

বিষাক্ত বাণের আঘাত
জামুগার সঙ্গে যুদ্ধে চেঙ্গিস খানের ঘাড়ে একটা বিষাক্ত বাণ এসে বিঁধেছিল। সেই ঘটনার বিষয়ে ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকলিন লিখেছেন, "সেই সময়ে তীরের উপর সাপের বিষ প্রয়োগ করা হতো। এই জাতীয় বাণের ফলা তীক্ষ্ণ হতো যার মাধ্যমে বিষ একবার শরীরে ঢুকলে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতো এবং বিষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত।"

"এর চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল ক্ষত ধুয়ে ফেলা এবং আহত ব্যক্তিকে দুধ খাওয়ানো। তবে চেঙ্গিসের আঘাত গুরুতর ছিল, কারণ তার ঘাড়ের একটা শিরা কেটে গিয়েছিল তীরের আঘাতে এবং সেখান থেকে ব্যাপক রক্তপাতও হচ্ছিল।"

"সেই সময় চেঙ্গিসের অন্যতম কমান্ডার জেলমে তার জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। জেলমে রক্তপাত থামাতে পারেননি তাই চেঙ্গিসের ঘাড় থেকে বিষাক্ত রক্ত চুষে নিয়ে থুতু ফেলতে থাকেন তিনি।"

এর কিছুক্ষণ পর চেঙ্গিস খানের চেতনা ফিরে আসে। এরপর তার জন্য দুধের ব্যবস্থাও করেন জেলমে।

কিন্তু চেঙ্গিস খান তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। তিনি জেলমেকে বলেন, "তুমি কি বিষাক্ত রক্ত চোষার পর আরো কিছুটা দূরে থুতু ফেলতে পারতে না?"

নেতিবাচক দিক
চেঙ্গিস খানের ব্যক্তিত্বের একাধিক নেতিবাচক দিক রয়েছে। তবে একইসঙ্গে বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ জানিয়েছেন তার রাজনৈতিক কৌশল সংক্রান্ত দক্ষতা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই।

রাশিয়ার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন জর্জ ভার্নাদস্কি। তিনি তার বই 'মঙ্গোলস অ্যান্ড রাশিয়া'-এ লিখেছিলেন, "সামরিক কৌশলের নিরিখে অতুলনীয় ছিলেন চেঙ্গিস। তবে তিনি যুদ্ধের কমান্ডারের হিসাবে তেমন প্রভাবশালী ছিলেন না।"

"মানুষের মনস্তত্ত্ব পড়ার ক্ষমতা ছিল আশ্চর্যজনক, তার কল্পনাশক্তিও ছিল প্রশংসনীয়। তিনি অনেক ব্যক্তিগত চড়াই উতরাইয়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। দূরদর্শী, সংযত ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন তিনি। একইসঙ্গে তার মধ্যে নিষ্ঠুরতা, অকৃতজ্ঞতা এবং প্রতিহিংসা পরায়ণতার মতো নেতিবাচক দিকও ছিল।"

মার্কিটের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তার স্ত্রী বোর্তকে অপহরণ করা হয়েছিল।

'দ্য সিক্রেট লাইফ অফ দ্য মঙ্গোলস' বইয়ে তাকে এই কারণে সমালোচনা করা হয়েছে। কারণ মা হোলুনসহ অন্যান্য নারীরা মার্কিটদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচলেও চেঙ্গিস খান তার স্ত্রীকে প্রতিপক্ষের হাতে পড়তে দিয়েছিলেন।

ওই বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে বোর্তকে মার্কিটরা অপহরণ করতে পেরেছিল কারণ স্ত্রীর ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে পালিয়েছিলেন চেঙ্গিস খান।

বেহতেরকে হত্যার পর চেঙ্গিসের মা তাকে 'পশু' ও 'শয়তান' বলে তিরস্কার পর্যন্ত করেছিলেন।

চেঙ্গিস খান অতি সতর্কতা এবং মনোযোগী হওয়ায় বিশ্বাসী ছিলেন। সেনাবাহিনীকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া তার স্বভাবে ছিল না।

ভয়ঙ্কর রাগ
জানা গিয়েছে চেঙ্গিস খান প্রায়শই মেজাজ হারাতেন। ১২২০-র দশকে ট্রান্সক্সিয়ানা দখল করার পরে, পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম রাজকুমারদের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের জন্য একজন দোভাষী এবং লিপিকারকে নিয়োগ করেছিলেন তিনি।

মিনহাজ সিরাজ জুজদানি তার বই 'তবাকাত-ই-নাসিরি' বইয়ে লিখেছেন, "চেঙ্গিস খবর পেয়েছিলেন মসুলের যুবরাজ সিরিয়া আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। তিনি ওই লিপিকারকে একটা চিঠি লিখতে বলেছিলেন যেখানে উল্লেখ করা হবে যে যুবরাজ যেন এমন পদক্ষেপ নেওয়ার দুঃসাহস না দেখান।"

"ওই লিপিকার নিজস্ব কূটনৈতিক চিন্তা ভাবনা থেকে চিঠির ভাষা একটু নরম করেছিলেন এবং মসুলের যুবরাজের উদ্দেশ্যে ইসলামী বিশ্বে প্রচলিত সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করেন।"

"চেঙ্গিস যখন মঙ্গোলীয় ভাষায় ওই চিঠি পড়েন, তখন তিনি ব্যাপক রেগে যান। রাগে কাঁপতে কাঁপতে ওই লিপিকারকে তিনি বললেন-আপনি বিশ্বাসঘাতক। এই চিঠি পড়ার পর মসুলের যুবরাজ আরও অহংকারী হয়ে উঠবে।"

তারপর তালি বাজিয়ে এক সৈন্যকে ডেকে ওই লিপিকারকে হত্যা করার আদেশ দেন চেঙ্গিস খান।

নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি উদারতা
চেঙ্গিস খানের নিষ্ঠুরতা নিয়ে আরো অনেক গল্প রয়েছে। তার শাসনকালে যেকোনো শহর দখল করার পর তরুণ ও শারীরিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের ছাড়া বাকিদের মাঠে দাঁড় করিয়ে হত্যার রীতি সাধারণ ঘটনা ছিল।

জেকব অ্যাবট তার বই 'দ্য হিস্ট্রি অব চেঙ্গিস খান'-এ লিখেছেন, "একবার এক বৃদ্ধা মঙ্গোলদের কাছে নিজের জীবন ভিক্ষা চান। পরিবর্তে মূল্যবান মুক্তো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। চেঙ্গিসের সৈন্যরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল ওই মুক্তো কোথায় রাখা আছে?"

"উত্তরে ওই নারী জানিয়েছিলেন, তিনি মুক্তো গিলে ফেলেছেন। ওই মুক্তো পাওয়ার জন্য তলোয়ার দিয়ে তার পেট কেটে ফেলেছিল সৈন্যরা। সেই মুক্তোর খোঁজ অবশ্য শেষপর্যন্ত পেয়েছিল তারা।"

ঘটনাটা এখানেই শেষ হয়নি।

'দ্য হিস্ট্রি অব চেঙ্গিস খান' বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, "এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুভব করেন যে অন্যান্য নারীরাও নিশ্চয়ই একইভাবে মুক্তো গিলে নিয়ে মূল্যবান রত্ন লোকানোর চেষ্টা করেছে। ফলস্বরূপ মূল্যবান মুক্তোর সন্ধানে বহু নারীর পেট পেট একইভাবে কেটে ফেলা হয়েছিল।"

তার নাতি-নাতনিদের খুবই ভালোবাসতেন চেঙ্গিস খান। পল রাচনিভস্কি তার বই, 'চেঙ্গিস খান: হিজ লাইফ অ্যান্ড লিগেসি'তে লিখেছেন, "বামিয়ান অবরোধের সময় তার এক নাতির মৃত্যু হয়েছিল। সেই রাগে ওই অঞ্চলের সকলকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল চেঙ্গিস খান। এমনকি কুকুর, বিড়াল এবং মুরগিও রক্ষা পায়নি।"

তবে তার আকস্মিক উদারতা অনেককে আশ্চর্য করেছে। একবার তিনি লক্ষ্য করেন প্রখর রোদে এক কৃষকের ঘাম ঝরছে। এই দৃশ্য দেখে তিনি ওই কৃষকের সমস্ত কর মাফ করে দেন এবং ক্রীতদাস অবস্থা থেকে মুক্ত করেন।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

নির্মমতাকে যুক্তিযুক্ত বলে আখ্যা দেওয়া
চেঙ্গিস খান যে একজন নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি ছিলেন সে কথা প্রায় সব ঐতিহাসিকই মেনে নিয়েছেন।

এমনকি কয়েকজন ঐতিহাসিক তাকে একজন মানসিক রোগী বলেও অভিহিত করেছেন। হত্যাকাণ্ডের পেছনে চেঙ্গিস খান অবশ্য এই যুক্তি দাঁড় করেছেন যে তিনি সব সময় বিশ্বাসঘাতক ও প্রতারকদেরই হত্যা করেছেন।

ভার্নাডস্কি লিখেছেন, "এই দিক থেকে তার সমকক্ষরা কিন্তু চেঙ্গিসকে অসাধারণ বলে বিবেচনা করেননি। কারণ ২১ শতকে আমরা যাকে অপরাধ বলে মনে করি তা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সাধারণ বিষয় ছিল এবং খ্রিস্টান আক্রমণকারীরাও সেদিক থেকে পিছিয়ে ছিল না।"

"নিষ্ঠুরতার দিক থেকে তার নামডাক ষোলশ শতকের ইংল্যান্ডের অষ্টম হেনরির চেয়ে কম ছিল। নিষ্ঠুরতার দিক থেকে তৈমুরলাং এমনকি চীনারাও তার চেয়ে এগিয়েছিল।"

চেঙ্গিস খান সবসময় দাবি করেছিলেন যে তার 'আত্মসমর্পণ বা মৃত্যু'-র মধ্যে যে কোনো একটা বাছতে বলার নীতি শত্রুদের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে একটা সুযোগ দিয়ে এসেছে। তিনি না কি সেই সমস্ত ব্যক্তিদেরই হত্যা করেছেন যখন তারা এই দুই বিকল্পের মধ্যে একটা বেছে নেননি।

চেঙ্গিস খান সম্পর্কে কথিত রয়েছে যে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে তিনি কখনো ঘোড়ার পিঠ থেকে নামেননি। কখনো আরামদায়ক বিছানায় ঘুমাতেন না। শুধু তাই নয়, তিনি সাধারণত ক্ষুধার্ত থাকতেন এবং সব সময় মৃত্যু ভয়ে থাকতেন।

ভারত সীমান্ত থেকে ফিরে আসার ঘটনা
চেঙ্গিস খান ১২১১ থেকে ১২১৬ সাল অর্থাৎ পাঁচ বছর কাটিয়েছিলেন মঙ্গোলিয়া থেকে দূরে। সেই সময় তার লক্ষ্য ছিল চীনকে জয় করার।

তিনি ভারত সীমান্তে এসে পৌঁছেছিলেন জালাল আল-দিনকে ধাওয়া করে। দুই পক্ষের মধ্যে শেষ যুদ্ধ হয়েছিল সিন্ধু নদীর তীরে।

জালাল আল-দিন ছিলেন মধ্য এশিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত এলাকার শাসনকারী খাওয়ারিজম শাহ সাম্রাজ্যের শেষ শাসক, যিনি মঙ্গোলদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

চেঙ্গিস খানের সেনাবাহিনী জালাল আল-দিনের সেনাবাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল। কোণঠাসা অবস্থায় জালাল আল-দিনের পিছনে ছিল সিন্ধু নদী।

উইলহেম বার্থহোল্ড তার বই 'তুর্কিস্তান ডাউন টু দ্য মঙ্গোল আক্রমণ' বইয়ে লিখেছেন, "চেঙ্গিস জালালের সমস্ত নৌকা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন যাতে তার সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে না পারেন। চেঙ্গিসের কাছে তার চেয়ে বেশি সৈন্য ছিল। জালাল আল-দিন চেঙ্গিসের প্রথম আক্রমণকে ব্যর্থ করেছিলেন।"

"তবে চেঙ্গিসের সমস্যা ছিল যে তার সৈন্যরা খুবই ছোট অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিল, যার ফলে তীর নিক্ষেপ করতে সমস্যা হচ্ছিল এবং তাদের তলোয়ার দিয়ে লড়াই চালাতে হতো ।"

এই যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে মোহাম্মদ নেসাভি লিখেছেন, "যুদ্ধে যখন মঙ্গোলদের পাল্লা ভারী, সেই সময় জালাল আল-দিন তার ঘোড়া নিয়ে ১৮০ ফুট গভীর সিন্ধু নদীতে ঝাঁপ দেন। ২৫০ গজ পেরিয়ে নদীর অন্য তীরে পৌঁছন তিনি।"

"জালাল আল-দিনের সাহসিকতা দেখে তাকে নিশানা করতে মানা করেন চেঙ্গিস। তবে তার (জালাল আল-দিনের) অন্যান্য সঙ্গীদের রেহাই দেননি তিনি। চেঙ্গিসের তীরন্দাজরা জালাল আল-দিনের বেশিরভাগ সঙ্গীকেকে নিশানা করে হত্যা করে। জালালের ছেলে এবং পুরুষ আত্মীয়দের চেঙ্গিস মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।"

এরপর জালাল আল-দিন দিল্লিতে চলে যান। কিন্তু সেখানকার সুলতান ইলতুৎমিস মঙ্গোলদের আক্রমণের ভয়ে তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেন।

বাধ সাধল ভারতের তাপমাত্রা
জালাল আল-দিন দিল্লিতে যাননি, তবে তবে তিনি ভারতেই ছিলেন যতদিন না চেঙ্গিস খান তাকে ধাওয়া করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেন।

যখন তিনি নিশ্চিত হন যে চেঙ্গিস খান নিজের দেশ মঙ্গোলিয়ায় ফিরে গিয়েছেন, তখন জালাল আল-দিন নৌকায় সওয়ার হয়ে সমুদ্রপথে ইরানে পৌঁছান।

প্রসঙ্গত, চেঙ্গিস খানের অতীত ঘাঁটলে অবশ্য এই বিষয়টা আশ্চর্যজনক লাগতে পারে যে জালাল আল-দিনকে ধাওয়া করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেন এবং ভারতের ভেতরে তার সেনাবাহিনীকে পাঠাননি।

ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকলিন লিখেছেন, "আসলে বালা ও ডরবি ডক্সনের নেতৃত্বে চেঙ্গিস ভারতে দুই ভাগে সেনা পাঠিয়েছিলেন। সিন্ধু নদী পেরিয়ে লাহোর ও মুলতান আক্রমণ করে কিন্তু তারা মুলতান দখল করতে পারেনি।"

"অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানকার উত্তাপ যার সঙ্গে তারা একেবারেই অভ্যস্ত ছিলেন না।"

"দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিস জালাল আল-দিনকে আশ্রয় না দিলেও তাকে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে চেঙ্গিসকে উৎসাহ দেননি।"

জন ম্যাকলিওড তার বই 'হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া'-তে লিখেছেন, "চেঙ্গিসকে সরাসরি না করে তাকে ক্ষুব্ধ করেননি ইলতুৎমিস। তিনি একদিকে যেমন হ্যাঁ বলেননি তেমনই চেঙ্গিসকে ভারতে প্রবেশ করে জালাল আল-দিনের পিছু নেওয়ার অনুরোধেও রাজি হননি।"

"তিনি (চেঙ্গিস খান) বুঝতে পেরেছিলেন যে ইলতুৎমিস এই বিষয়ে নিয়ে তার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চান না। তিনি নিজেও ইলতুৎমিসের সঙ্গে লড়াই মেজাজে ছিলেন না।"

ড. উইঙ্ক তার 'স্লেভ কিংস অ্যান্ড দ্য ইসলামিক কনকোয়েস্ট' বইয়ে লিখেছেন, "চেঙ্গিদের জন্য, ভারতের তাপমাত্রা অসহনীয় ছিল। এ কারণেই চেঙ্গিসের জেনারেলরা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।"

আরও পড়ুন