শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৮:৪৬, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৯:০১, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) ছবি: সংগৃহীত।
ওল্ড ফোর্থ ওয়ার্ডের অবার্ন অ্যাভিনিউতে এক হাড়কাঁপানো শীতের সকালে জন ওয়াটার্স সেই বাদামী ও ক্রিম রঙের ভিক্টোরিয়ান বাড়িটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন, যেখানে ১৯২৯ সালে রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ৪৭ বছর বয়সী ওয়াটার্স কানেকটিকাটের নিউ হ্যাভেন থেকে আসা একজন ড্রাম শিক্ষক। এমএলকে ছুটির সপ্তাহে আটলান্টা ভ্রমণে আসা ওয়াটার্স এর আগেও একবার এখানে এসেছিলেন—১২ বছর আগে, তার ড্রিল টিমের প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে।
৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী সেই শিশুদের প্রতিক্রিয়া ছিল অবিস্মরণীয়। ওয়াটার্স তার ছাত্রদের কিংসের বাড়ি, তার সমাধি এবং ইবেনজার ব্যাপটিস্ট চার্চে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এই নেতা শৈশবে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং ১৯ বছর বয়সে যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছিলেন, লিখেছে আটলান্টা জার্নাল কন্সটিটিউশন পত্রিকা।
পুরানো স্মৃতিচারণ করে ওয়াটার্স বলেন, "তারা কাঁদছিল। এতগুলো বাচ্চার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যখন তারা জায়গাগুলো নিজের চোখে দেখল, তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না। তাদের চোখে জল ছিল, এমনকি কিছু অভিভাবকের চোখেও। বইয়ে পড়া বা শিক্ষকদের মুখে শোনার চেয়ে সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে আসলে আপনি সবকিছু বিস্তারিতভাবে অনুভব করতে পারবেন।"
প্রথম সফরের এক যুগ পর দুই বন্ধুর সাথে আবারও এখানে এসে ওয়াটার্স বলেন, এবার জায়গাগুলো তাকে আরও গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তিনি বলেন, "বর্তমানে দেশে যা ঘটছে এবং মানুষ যেভাবে প্রতিবাদ করছে, তা দেখে মনে হচ্ছে আমরা যেন সেই পুরনো সময়ের মধ্য দিয়েই আবার যাচ্ছি। এটা বেদনাদায়ক। আমি এসব দেখছি আর ভাবছি, আমাদের আজও সেই একই লড়াই লড়ে যেতে হচ্ছে।"
কয়েক ব্লক দূরে, যেখানে মার্টিন লুথার কিং এবং তার স্ত্রী কোরেটা স্কট কিংসের সমাধি রয়েছে, সেই ঝর্ণা আর প্রতিফলিত জলাধারের পাড়ে আরেকজন দর্শনার্থী কিং সেন্টার ঘুরে দেখছিলেন। ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেল থেকে আসা ৩৬ বছর বয়সী শায়না সাউটম্যানের সাথে ছিল তার ৮ বছর বয়সী ছেলে জাস্টিস। জাস্টিস মাইকেল জ্যাকসনের টি-শার্ট পরে সেখানে মুনওয়াক অনুশীলন করছিল।
তারা মূলত একটি যুব বাস্কেটবল টুর্নামেন্টের জন্য আটলান্টা এলেও এই সুযোগে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কে ঘুরতে এসেছেন। দুই বছর আগে তাদের প্রথম সফরের সময় কিং পরিবারের বন্ধু ছিলেন এমন একজন বয়স্ক ব্যক্তির সাথে তাদের পরিচয় হয়। সাউটম্যান সেই ব্যক্তির নাম মনে করতে না পারলেও জানান যে, তিনি দয়ালু ছিলেন এবং তাদের পুরো এলাকাটি ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। জাস্টিসের বয়স তখন মাত্র ৬ বছর হলেও সেই স্মৃতি আজও তার মনে গেঁথে আছে। সাউটম্যান বলেন, "সেই অভিজ্ঞতাটি ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী।"
জাস্টিসের বাবা কৃষ্ণাঙ্গ। সাউটম্যান জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষকরা যেভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাস পড়ানো থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, তা তাকে হতাশ করেছে। তিনি বলেন, "কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাস সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি। যেহেতু জাস্টিস অর্ধেক কৃষ্ণাঙ্গ, তাই আমি মনে করি তার জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণভাবে সব জাতির মানুষের জন্যই এটি জানা অত্যন্ত দরকারি।"
রবিবার সকালে পার্কে আসা ভিড়টি ছিল বৈচিত্র্যময়। পার্কের মূল ভিজিটর সেন্টারটি সংস্কারের জন্য বন্ধ থাকায় ৬ নম্বর ফায়ার স্টেশনের অস্থায়ী কেন্দ্রে ভার্জিনিয়া থেকে আসা একটি জাপানি পরিবারকে দেখা যায়। ওকুদা, নাতসুকি, শোতা এবং মারিকো নামের এই চার সদস্য খুব সামান্য ইংরেজি জানলেও আগ্রহ নিয়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস খুঁটিয়ে দেখছিলেন।
মিডটাউনের বাসিন্দা এবং পিচট্রি ট্রলি কোম্পানির ট্যুর গাইড ৪৬ বছর বয়সী সিয়ানা জনসন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ফাউন্টেনে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন। তিনি জানান, এদিন সকালেই তিনি নিউজিল্যান্ড থেকে আসা পর্যটকদের দেখা পেয়েছেন। জনসন বলেন, "সারা বিশ্ব থেকে মানুষ এখানে আসছে। ইতিহাস এবং তথ্যগুলো যে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা দেখে ভালো লাগছে। আমি এ পর্যন্ত যত দেশের মানুষের সাথে মিশেছি, সবাই এই স্থানটির অস্তিত্ব নিয়ে দারুণ রোমাঞ্চিত। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে এটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।"
একজন ট্যুর গাইড হিসেবে তিনি জানান, এই ঐতিহাসিক স্থানগুলোর প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া অনেক গভীর হয়। তিনি বলেন, "এই পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। মানুষ যখন ইতিহাস অনুভব করে চোখের জল ফেলে, তখন সেটাকে 'ভালো লাগা' বলা হয়তো কিছুটা অদ্ভুত শোনায়; কিন্তু ডক্টর কিংসের সাথে যা ঘটেছিল এবং বর্তমানে যা ঘটছে, সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মানুষের এই সংবেদনশীলতা দেখলে আশ্বস্ত হওয়া যায় যে মানুষ আজও বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে।"

(মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এই বাসাতেই জন্ম নিয়েছিলেন। ছবি: সংগৃহীত। )
এই ঐতিহাসিক পার্ক এলাকাটি আটলান্টার বাসিন্দা এবং পর্যটকদের জন্য কেবল ডক্টর কিং নয়, বরং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যান্য অগ্রগামীদের সম্পর্কেও জানার এবং অনুপ্রাণিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। অবার্ন অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটলে ডজনখানেক ঐতিহাসিক সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। যার মধ্যে একটি হলো ব্রায়ান্ট প্রিপারেটরি ইনস্টিটিউটের পুরোনো স্থান। এটি ছিল কৃষ্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি নৈশ বিদ্যালয়, যারা এমন এক সময়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন যখন স্কুলগুলোতে জাতিগত বিভেদ ছিল এবং অষ্টম শ্রেণীর পর কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের পড়ানো বন্ধ করে দেওয়া হতো।
অন্য একটি সাইনবোর্ড হার্পার হাউসের স্মৃতি বহন করে, যা ছিল শিক্ষাবিদ ও নাগরিক নেতা চার্লস লিঙ্কন হার্পারের বাড়ি। তিনি আটলান্টার বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি পরিবর্তনের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে রবিবার, অর্থাৎ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবসের আগের দিনটিতে পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে ডক্টর কিংসের ঝর্ণার কাছেই।
প্রবেশদ্বারে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের প্রয়াত স্ত্রী কোরেটা স্কট কিংসের একটি উক্তি রয়েছে। তিনি লিখেছেন, কিং সেন্টার "কেবল একটি স্থান বা দালান নয়, বরং এটি একটি আদর্শ বা আত্মা, যা অহিংসা এবং ভালোবাসার প্রয়োগ সম্পর্কিত কিংসের দর্শনের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।"
প্রাঙ্গণের অনেক খোদাই করা চিহ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অহিংসা মানেই নিষ্ক্রিয়তা নয়। একটি দেয়ালে কোরেটা স্কট কিংসের উক্তিটি এভাবে লেখা আছে: "যারা মনে করেন অহিংসা খুব সহজ কাজ, তারা উপলব্ধি করতে পারেন না যে এটি একটি আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা। এর জন্য প্রচুর শক্তি, আত্মিক বিকাশ এবং নিজেকে শুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়, যাতে নিজের কল্যাণের কথা চিন্তা না করে সবার মঙ্গলের জন্য যেকোনো বাধা অতিক্রম করা যায়।"
অন্যান্য ফলকগুলোতে অহিংসার ছয়টি মূল নীতি প্রদর্শিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে— "অহিংসা বন্ধুত্ব ও সমঝোতা অর্জনের চেষ্টা করে" এবং "অহিংসা ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসাকে বেছে নেয়।"
ঘড়ির কাঁটায় যখন দুপুর এবং সূর্যের তাপে সকালের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা কিছুটা কমতে শুরু করেছে, তখন রাস্তার উল্টো পাশে থাকা ইবেনজার ব্যাপটিস্ট চার্চ থেকে উপাসনা শেষ করে পুণ্যার্থীরা দলে দলে কিং সেন্টারের প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন। তারা ঝর্ণা, চিরন্তন শিখা এবং খোদাই করা সেই শব্দগুলো পেরিয়ে যাচ্ছিলেন, যা প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে যে— ন্যায়ের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।