ঢাকা, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

৫ শ্রাবণ ১৪৩৩, ০৩ সফর ১৪৪৮

অর্থমন্ত্রী বললেন

পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকারের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে

২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতি হবে ট্রিলিয়ন ডলারের

বাসস

প্রকাশ: ১৭:০১, ৬ এপ্রিল ২০২৬

পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকারের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে

সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফাইল ছবি

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের পুঁজিবাজারকে উন্নত, প্রাণবন্ত ও গতিশীল করতে সরকারের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি শক্তিশালী উৎসে পরিণত হয়।

তিনি সংসদে সোমবার সরকারি দলের সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম (নোয়াখালী-৫)-এর তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান।

মন্ত্রী বলেন, সরকার পুঁজি বাজারকে শক্তিশালী ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নিরলসভাবে কাজ করছে।
এ সময় তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুঁজিবাজারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে, সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারেও এ খাতের উন্নয়নে নির্দিষ্ট অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করেছে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আর্থিক পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে একটি টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে।

তিনি জানান, বাজারের গভীরতা বাড়াতে শক্তিশালী বন্ড বাজার গড়ে তোলা, মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা ও তালিকাবহির্ভূত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ), সুকুক (ইসলামিক বন্ড) ও গ্রিন বন্ড চালু, মিউচুয়াল ফান্ডে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কমোডিটি ও ফাইন্যান্সিয়াল ডেরিভেটিভস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে অনিয়ম ও কারসাজি বন্ধ, তদন্ত ও প্রয়োগ কার্যক্রম জোরদার, বাজার আধুনিকীকরণ ও ডিজিটালাইজেশন, দেশ-বিদেশ থেকে সহজে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা ও কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরও জানান, ১৯৬৯ সালের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স এবং ১৯৯৩ সালের বিএসইসি আইন একীভূত করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ২০২৫-এর খসড়া পর্যালোচনাধীন রয়েছে। এছাড়া অবণ্টিত লভ্যাংশ, আইপিও তহবিল ও অদাবিকৃত শেয়ার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন, ২০২৬-এর খসড়াও পর্যালোচনায় রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা বিধিমালা, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স রুলস ২০২৬ ও টেকসই বন্ড অন্তর্ভুক্ত করে ডেট সিকিউরিটিজ রুলস ২০২১ সংশোধন এবং অডিটর ও অডিট ফার্ম তালিকাভুক্তির কাজ চলমান রয়েছে।

বিনিয়োগ সচেতনতা বাড়াতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বিনিয়োগ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ আয়োজন এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং জেলা তথ্য অফিসগুলো জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে। ‘নিরাপদ বিনিয়োগ, সচেতন নাগরিক’ কর্মসূচির আওতায় তৃণমূল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘পুঁজিবাজারের জানা-অজানা’ শিরোনামে পাক্ষিক বিনিয়োগ শিক্ষা অনুষ্ঠান সম্প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি ও স্পোর্টস অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আজ সংসদে সরকারি দলের সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন (ঢাকা-১৮)-এর লিখিত প্রশ্নের জবাবে- এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির জন্য সরকার একটি নির্দিষ্ট খাত নয়, বরং বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করেছে। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি, প্রবাস আয়, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবগুলো ক্ষেত্রকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব কমাতে উৎপাদন, নির্মাণ, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে কাজের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এতে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পাবে এবং ধীরে ধীরে মাথাপিছু আয়ও বাড়বে।

বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণ সহজ করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং উৎপাদনমুখী খাতে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নতুন কারখানা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় সহজ অর্থায়ন, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান এবং বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং নতুন আয়ের পথ তৈরি হবে।

তিনি জানান, রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা, বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের কাজ চলছে। একইসঙ্গে প্রবাস আয় বাড়াতে বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী আরও জানান, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে গ্রামীণ আয় বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি চাঙা হবে।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের একটি অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, আর বাকি পদক্ষেপগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এসব সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের আয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব হ্রাস, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

 

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন