শিরোনাম
বিবিসি
প্রকাশ: ১০:০৩, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১০:০৪, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মেক্সিকোর কুলিয়াকান শহরটি এখন ড্রাগ কার্টেল-এর দুই পক্ষের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত।
মেক্সিকোর সিনালোয়া অঙ্গরাজ্যের কুলিয়াকান শহরটি বর্তমানে এক ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ড্রাগ কার্টেলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেখানকার সাধারণ মানুষের আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার চিত্র।
‘ভয় এখন সর্বত্র’: মেক্সিকোর কুলিয়াকান যখন ড্রাগ কার্টেলের রণক্ষেত্র
মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কুলিয়াকান। একসময় যা ছিল প্রাণচঞ্চল, আজ তা এক পরিত্যক্ত জনপদ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুড়ে যাওয়া গাড়ির কঙ্কাল, বাতাসে বারুদের গন্ধ আর জনশূন্য রাজপথ জানান দিচ্ছে—এখানে এখন শাসন করছে ভয়। সিনালোয়া কার্টেলের দুটি শক্তিশালী উপদলের মধ্যে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শহরটিকে কার্যত একটি নরকে পরিণত করেছে।
যুদ্ধের সূত্রপাত
এই সংঘাতের মূলে রয়েছে কার্টেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতার লড়াই। একদিকে রয়েছে কার্টেলের প্রতিষ্ঠাতা ইসমায়েল ‘এল মায়ো’ জাম্বাদার অনুগত বাহিনী, আর অন্যদিকে কার্টেলের অপর প্রতিষ্ঠাতা ‘এল চ্যাপো’ গুজমানের ছেলেদের অনুসারী, যারা ‘লস চ্যাপিতোস’ নামে পরিচিত। গত জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে এল মায়োর নাটকীয় গ্রেপ্তারের পর থেকেই এই উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। এল মায়ো অভিযোগ করেছেন যে, চ্যাপোর ছেলেরাই তাকে অপহরণ করে মার্কিন কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে। এই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র প্রতিশোধ নিতেই শুরু হয়েছে এই ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ।

জনজীবনে বিভীষিকা
কুলিয়াকানের সাধারণ মানুষ এখন নিজেদের বাড়িতেই বন্দী। স্কুল-কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ভয়ে দোকানপাট খুলছেন না। শহরের চর্তুদিকে এখন কেবল সশস্ত্র ক্যাডারদের টহল এবং সেনাবাহিনীর ভারী যান চলাচলের শব্দ।
এক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভয় এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা জানি না কখন আমাদের জানালার কাঁচ ভেঙে গুলি ভেতরে আসবে। বাইরে বের হওয়া মানেই মৃত্যুর পরোয়ানা হাতে নিয়ে চলা।” শহরের প্রতিটি মোড়ে এখন এক অদৃশ্য সীমান্ত তৈরি হয়েছে। কোন এলাকা কার দখলে, তা সাধারণ মানুষের অজানা, আর এই অজানাই তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
রাজপথে লাশের মিছিল
গত কয়েক সপ্তাহে কুলিয়াকান এবং এর আশেপাশে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন সকালে রাস্তার পাশে বা জনাকীর্ণ স্থানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যাচ্ছে। কার্টেলগুলো তাদের শক্তির মহড়া দিতে এবং প্রতিপক্ষকে সতর্ক করতে মৃতদেহগুলোকে বীভৎসভাবে প্রদর্শন করছে। অপহরণ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তরুণদের জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কার্টেলের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য। যারা রাজি হচ্ছে না, তাদের পরিণতি হচ্ছে অত্যন্ত করুণ।
প্রশাসনের অসহায়ত্ব
মেক্সিকান সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। কিন্তু বাস্তবে সেনাবাহিনী এবং ন্যাশনাল গার্ডের উপস্থিতি এই সহিংসতা কমাতে খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেনাবাহিনী কেবল মৃতদেহ উদ্ধার এবং সংঘর্ষ পরবর্তী ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কারের কাজে সীমাবদ্ধ। কার্টেলগুলোর কাছে থাকা অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং ড্রোন প্রযুক্তির সামনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী মাঝে মাঝে অসহায় বোধ করছে।
প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউমের নতুন সরকারের জন্য এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেক্সিকো সরকার এই সহিংসতাকে ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল’ হিসেবে দেখলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়
কুলিয়াকান মেক্সিকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শহরের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ। ছোট ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হওয়ার পথে। অনেক পরিবার তাদের সর্বস্ব ফেলে শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে যাচ্ছে।
মানবিক সংকট
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ থাকায় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তার চেয়েও ভয়াবহ হলো তাদের মানসিক স্বাস্থ্য। অবিরাম গোলাগুলি এবং গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দে একটি পুরো প্রজন্ম ট্রমার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। সাহায্যকারী সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, দ্রুত এই সংঘাত বন্ধ না হলে মেক্সিকো এক দীর্ঘমেয়াদী মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হবে।
কুলিয়াকানের এই পরিস্থিতি কেবল একটি শহরের গল্প নয়, এটি মেক্সিকোর ড্রাগ ওয়ার বা মাদক যুদ্ধের এক কালো অধ্যায়। কার্টেলের শীর্ষ নেতাদের ক্ষমতার লোভ আর ইগো’র লড়াইয়ে বলি হচ্ছে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। বিবিসি’র প্রতিবেদনে এই রূঢ় সত্যটিই ফুটে উঠেছে যে, যেখানে আইনের শাসনের চেয়ে অস্ত্রের ভাষা শক্তিশালী হয়, সেখানে শান্তি এক সুদূরপরাহত কল্পনা।
কুলিয়াকানের আকাশে এখন কেবল ধোঁয়া আর বিষণ্ণতা। বাসিন্দাদের চোখেমুখে একটাই প্রশ্ন—এই রক্তপাত কবে থামবে? মেক্সিকোর এই ‘ওয়ার জোন’ থেকে কবে আবার স্বাভাবিক জীবনের বার্তা আসবে, তা আজ কারোরই জানা নেই। আপাতত ‘ভয়’ই সেখানে একমাত্র ধ্রুব সত্য।