শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯:৪৬, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৯:৪৭, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত।
নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যা দ্বিগুণ করা থেকে শুরু করে ইউরোপীয় কমিশনের এয়ার সেফটি লিস্ট (কালো তালিকা) থেকে নেপালকে মুক্ত করার মতো বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দলগুলো বিমান চলাচলে সংস্কার, ওয়েলনেস ব্র্যান্ডিং এবং নতুন পর্যটন গন্তব্য তৈরির অঙ্গীকার করেছে।
চারটি প্রধান রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে পর্যটনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে। তারা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যটকের সংখ্যা এবং তাদের ব্যয় দ্বিগুণ করার পাশাপাশি বিমান নিরাপত্তা সংস্কার এবং ভারতের সাথে অতিরিক্ত বিমান পথ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, খবর কাঠমান্ডু পোস্টের।
সবগুলো দলের ইশতেহারে একটি সাধারণ মিল রয়েছে—ইউরোপীয় কমিশনের এয়ার সেফটি লিস্ট থেকে নেপালকে সরিয়ে নেওয়া এবং দেশের নতুন দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সম্প্রসারণ করা।
রবি লামিছানের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) আগামী পাঁচ বছরে পর্যটকের সংখ্যা, তাদের গড় ব্যয় এবং অবস্থানের সময়কাল দ্বিগুণ করার অঙ্গীকার করেছে। গত তিন বছর ধরে নেপালে বার্ষিক ১০ লাখের কিছু বেশি পর্যটক আসছে, যা কোভিড-পূর্ব ২০১৯ সালের পর্যায়ের নিচে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বারবার বিমান দুর্ঘটনা, দুর্বল মহাসড়ক অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক প্রচারের অভাব পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে।
আরএসপি-র ইশতেহারে কাঠমান্ডু মহানগরীর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ (বালেন)-কে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কর্ণালী ও সুদূরপশ্চিম প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে নতুন পর্যটন গন্তব্য তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পর্যটকদের সময় ও খরচ বাঁচাতে ট্রেকিং, ন্যাশনাল পার্ক এবং ঐতিহ্যবাহী স্থানের পারমিট ইস্যু করার জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ‘ওয়ান-ডোর পলিসি’ বা একমুখী সেবা চালুর প্রস্তাব করেছে দলটি। এছাড়া পাহাড়ি অঞ্চলে উদ্ধারকাজের জন্য ড্রোন মোতায়েন এবং ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন শহরগুলোর কাছাকাছি হিল স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিমান চলাচল খাতে সংস্কারের জন্য আরএসপি নেপাল সিভিল এভিয়েশন অথরিটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা পুনরায় ব্যক্ত করেছে—একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অন্যটি সেবা প্রদানকারী সংস্থা। এছাড়া ঋণে জর্জরিত নেপাল এয়ারলাইনস কর্পোরেশনকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মডেলে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে সরকারের ৫১ শতাংশ শেয়ার থাকবে।
আরএসপি (RSP) আরও জানিয়েছে যে, গৌতম বুদ্ধ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং পোখরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণ সক্ষমতায় সচল করতে তারা ফি মকুফ এবং বিপণন প্রণোদনা প্রদান করবে। এছাড়া, ভারতের সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে জানকপুর, ভৈরাহওয়া, নেপালগঞ্জ এবং মহেন্দ্রনগর দিয়ে চারটি আন্তঃসীমান্ত বিমান পথ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি, যা গত দুই দশক ধরে ঝুলে আছে।
নেপালি কংগ্রেস তাদের ইশতেহারে ভিন্নধর্মী কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা 'ওয়েলনেস' এবং আধ্যাত্মিক পর্যটনকে প্রাধান্য দিয়ে “আরোগ্য নেপাল” ক্যাম্পেইন চালুর প্রস্তাব করেছে। এর আওতায় যোগব্যায়াম, ধ্যান, আয়ুর্বেদ এবং ঔষধি ভেষজকে একটি জাতীয় গৌরব প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। দলটি নেপালকে বিশ্বের "আধ্যাত্মিক রাজধানী" হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে চায় এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য "ওয়েলনেস ও ডিজিটাল নোম্যাড ভিসা" চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কংগ্রেসের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে:
প্রধান পর্যটন এলাকাগুলোতে ওয়েলনেস জোন এবং যোগ ল্যাবরেটরি তৈরি।
নেপালি সংস্কৃতি ও জীবনধারা উপভোগের জন্য কমিউনিটি হোমস্টে এবং আরবান হোমস্টে কর্মসূচি।
কাঠমান্ডু, পোখরা, লুম্বিনী এবং জানকপুরের মতো স্থানে আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন।
“বুদ্ধ-টু-শিব” সার্কিট এবং ডিজিটাল করিডোর তৈরি করে প্রধান তীর্থস্থানগুলোকে যুক্ত করা।
নেপাল এয়ারলাইনসকে ছয় মাসের মধ্যে সংস্কার করে একে "জনগণের পতাকাবাহী" (people’s flag carrier) হিসেবে গড়ে তোলা।
আগামী ১০ বছরের মধ্যে বার্ষিক ৩০ লাখ পর্যটক আকর্ষণ এবং জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করা।
অন্যদিকে, সিপিএন-ইউএমএল (CPN-UML) পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজারজাতকরণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাদের মূল স্লোগান হলো “পর্যটকদের নিরাপত্তা সবার আগে”। তারা আগামী পাঁচ বছরে পর্যটকের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে সোশ্যাল মিডিয়া, ট্রাভেল ব্লগার এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে নেপালের প্রচার চালানোর পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং ইকো-লজে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
পুষ্প কমল দাহালের নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি নেপাল এয়ারলাইনস এবং বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোতে প্রযুক্তিগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই সাথে ইউরোপীয় কমিশনের এয়ার সেফটি লিস্ট থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে তারা। দলটি ভৈরাহওয়া এবং পোখরা থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সম্প্রসারণের পাশাপাশি ইকো-ট্যুরিজম, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, স্বাস্থ্য ও ভেষজ পর্যটন প্রসারের ঘোষণা দিয়েছে।
দলটির অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে:
ভারতীয় সীমান্তের কাছে ১৫টিরও বেশি হিল স্টেশন এবং রিসোর্টকে বিনোদন কেন্দ্র, বিয়ের গন্তব্য (wedding destination) এবং ইকো-ট্যুরিজম জোন হিসেবে গড়ে তোলা।
পর্বতারোহণের জন্য হিমালয়ের ৯৭টি স্বল্প পরিচিত চূড়া উন্মুক্ত করে দেওয়া।
বিশিষ্ট হোটেল ব্যবসায়ী যোগেন্দ্র শাক্য পর্যটন খাতে এই গুরুত্বারোপকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়নের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, "লক্ষ্যগুলো খুব বেশি উচ্চাভিলাষী নয়, তবে সব কিছু নির্ভর করছে তারা কীভাবে তা বাস্তবায়ন করে তার ওপর। তারা ক্ষমতায় গেলে আমরা এই দলিলগুলো দেখে তাদের জবাবদিহি করব। ফাঁপা প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়।"
লন্ডন ভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নেপালের পর্যটন খাত থেকে ৩২৭.৯ বিলিয়ন রুপি (২.৫ বিলিয়ন ডলার) রাজস্ব আয় হয়েছে। এই খাতটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১১.৯ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, যা মোট কর্মসংস্থানের ১৫.২ শতাংশ। ২০২৩ সালে জিডিপিতে পর্যটন খাতের মোট অবদান ছিল ৩৫৮.৯ বিলিয়ন রুপি (২.৭ বিলিয়ন ডলার) বা ৬.৬ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের কোভিড-পূর্ববর্তী সময়ের (৬.৭ শতাংশ) তুলনায় কিছুটা কম।