শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২০:৪২, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২০:৫১, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
করাচির রাস্তায় কয়েকজন পাকিস্তানি-বাঙালি নারী। ঠিকানা পত্রিকার সৌজন্যে।
বাংলাদেশ থেকে প্রায় তিন দশক আগে অল্প কয়েক দিনের জন্য পাকিস্তানে গিয়েছিলেন শাহ আলম। কিন্তু দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক তিক্ততা ও নিজের আর্থিক সংকটের কারণে তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি, খবর যুক্তরাষ্ট্রের ঠিকানা পত্রিকার সৌজন্যে।
করাচির ব্যস্ত নগরজীবনে আটকে পড়া এই ৬০ বছর বয়সী বাঙালি এখন শুঁটকি বিক্রি করে কোনোভাবে জীবনধারণ করছেন।
শাহ আলমের জন্ম বাংলাদেশে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে তিনি যেন হয়ে উঠেছেন দুই দেশের মাঝখানে ঝুলে থাকা এক মানুষ। তাঁর মা-বাবা এবং প্রথম স্ত্রী বাংলাদেশে মৃত্যুবরণ করলেও শেষবারের মতো তাঁদের দেখা আর পাওয়া হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, জন্মভূমিতে ফেরার ইচ্ছা কোনোদিনই মুছে যায়নি। সম্প্রতি ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ায় তাঁর মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমি যাবই। ঈদুল আজহার পর ছেলেকে নিয়ে অবশ্যই যাব।”
করাচির পরিচিত ‘বেঙ্গলি মার্কেট’-এর কাছে বসে প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ডলারের বিনিময়ে শুঁটকি ও চিংড়ি বিক্রি করেন তিনি। বাংলাদেশে তাঁর এখনও কৃষিজমি ও পৈত্রিক বাড়ি রয়েছে। কিন্তু নানা জটিলতা ও অর্থাভাবে সেই ঘরে ফেরা হয়ে ওঠেনি। “সবকিছু ওখানেই আছে। আমি এখানে আটকা পড়ে আছি,” বলেন শাহ আলম।
রাষ্ট্রহীনতার শৃঙ্খল
ধারণা করা হয়, বর্তমানে পাকিস্তানে ১০ লাখের বেশি বাঙালি বসবাস করছেন। এদের বড় অংশই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বা তার আগে সেখানে যান। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও অনেকে পাকিস্তানে পূর্ণ নাগরিকত্ব পাননি। ফলে শিক্ষা, ব্যবসা, সম্পত্তি কেনাবেচা—সবক্ষেত্রেই বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
করাচির মাচ্ছর কলোনি—শহরের অন্যতম বৃহৎ বস্তি—বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানেই থাকেন ২০ বছর বয়সী হোসেন আহমেদ। মাছের আড়তে কাজ করা এই তরুণের কাছে পাকিস্তানের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। তাঁর বাবারও নেই। ফলে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবে তা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। “আমি যেতে চাই। কিন্তু কীভাবে যাব? আমার কোনো পরিচয় নেই,” বলেন তিনি।
২২ বছর বয়সী আরেক তরুণ আহমেদ জানান, তাঁর পরিবার ১৯৭১ সালের আগেই পাকিস্তানে বসবাস শুরু করে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকলেও নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ তিনি নিজেকে পাকিস্তানিই মনে করেন। “আমি একজন পাকিস্তানি, কিন্তু পরিচয়পত্র নেই,” তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভ।
বাঙালি অধ্যুষিত করাচির অধিকাংশ এলাকা বস্তি ঘেরা। বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাইরে বের হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদ ও নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়ার মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেকে সীমিত পরিসরেই জীবন কাটাতে বাধ্য হন।
কূটনৈতিক উষ্ণতায় আশার আলো
দীর্ঘ সময়ের শীতলতার পর সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতা ফিরেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গত আগস্টে ঢাকা সফর করেন এবং সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-এর সঙ্গে। পাকিস্তান ওই সফরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে গতি পায়। চলতি মাসে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরও এই ইতিবাচক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
করাচির স্থানীয় রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ রফিকুল হোসেন, যিনি পৌরসভায় বাঙালি সম্প্রদায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একজন, মনে করেন দুই দেশের সুসম্পর্ক পাকিস্তানি বাঙালিদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা পাকিস্তানের অর্থনীতিতে অবদান রাখছি। সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আমাদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ও জনগণের যোগাযোগ বাড়বে।”
অপেক্ষা স্বীকৃতির
রাষ্ট্রহীনতার সংকট, নাগরিকত্বের জটিলতা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানো জীবন—সব মিলিয়ে পাকিস্তানে বসবাসরত বহু বাঙালির কাছে ‘ফিরে যাওয়া’ এখন কেবল ভৌগোলিক বিষয় নয়, আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও। কেউ বাংলাদেশে ফিরতে চান, কেউ পাকিস্তানে নাগরিক স্বীকৃতি চান—কিন্তু সবাই চান একটিমাত্র জিনিস: নিশ্চিত পরিচয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন।
শাহ আলমের মতো অনেকে তাই দিন গুনছেন—কবে কাগজপত্রের জট খুলবে, কবে আবার নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন, “আমি ফিরে এসেছি।”