শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১:২৯, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
বীমা যেমন বিপদের সময় আর্থিক নিরাপত্তা দেয়, জলবায়ু পদক্ষেপও তেমনি পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সংকটের ঝুঁকি কমায়। ইউরোনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে বিনিয়োগ করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করবে। এটি কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর একটি কৌশল। Climate action is the world’s cheapest insurance policy, new study says শিরোনামে ইউরো নিউজের রিপোর্টে বলা হয়েছে জলবায়ু সংকট এখন আর কেবল তাপমাত্রার ডিগ্রী এবং কার্বন লক্ষ্যমাত্রার উপর নির্ভর করে না, বরং হাসপাতালে ভর্তি, কর্মঘণ্টা হারানো, অবকাঠামোগত ব্যর্থতা এবং ইতিমধ্যেই চাপে থাকা বাজেট থেকে জনসাধারণের অর্থের অপচয় ইত্যাদি সকল কিছুই এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত।
বিশাল আর্থিক ক্ষতির খতিয়ান
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশে চরম আবহাওয়া এবং জলবায়ুজনিত ঘটনার কারণে প্রায় ৫৬০ বিলিয়ন ইউরো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বিশাল ক্ষতির মাত্র ২৫% থেকে ৩৩% বীমার আওতাভুক্ত ছিল। অর্থাৎ, বাকি বিশাল অংকের লোকসান সরাসরি সাধারণ মানুষ ও সরকারকে বহন করতে হয়েছে।
২০৫০ সালের ভয়ংকর পূর্বাভাস
যদি জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। গবেষণায় বলা হয়েছে:
২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপে উৎপাদনজনিত ক্ষতির পরিমাণ ৫ ট্রিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যদি বিশ্বের তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তবে ইউরোপের মোট জিডিপি (GDP) প্রায় ১০% হ্রাস পাবে। এটি যেকোনো বড় ধরণের অর্থনৈতিক মন্দার চেয়েও ভয়াবহ।
কেন এটি 'সস্তা' বীমা?
গবেষকদের যুক্তি হলো, আজ আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই প্রযুক্তি এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর পেছনে যে অর্থ ব্যয় করব, তা ভবিষ্যতে হতে যাওয়া ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। অর্থাৎ, আজ সামান্য প্রিমিয়াম (বিনিয়োগ) দিয়ে আমরা ভবিষ্যতের বিশাল আর্থিক বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে পারি। একেই প্রতিবেদনে "Collective Risk Pooling" বা সমষ্টিগতভাবে ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া বলা হয়েছে।
নিষ্ক্রিয়তার চড়া মূল্য
যদি বর্তমান হারে কার্বন নিঃসরণ চলতে থাকে এবং আমরা কোনো পদক্ষেপ না নিই, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন—বন্যা, খরা, দাবানল) ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব অর্থনীতি যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে, তার পরিমাণ জলবায়ু পদক্ষেপের খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে বিশ্ব জিডিপি (GDP) নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থনৈতিক লাভ
ইউরোনিউজের রিপোর্টে জোর দেওয়া হয়েছে যে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য শক্তিতে (সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ) রূপান্তর হওয়া এখন আর কেবল পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক। বর্তমানে সৌর ও বায়ু শক্তির খরচ অনেক কমে এসেছে, যা কয়লা বা গ্যাসের চেয়েও সাশ্রয়ী।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
জলবায়ু সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করলে কেবল দুর্যোগই কমবে না, বরং এটি লক্ষ লক্ষ নতুন 'সবুজ কর্মসংস্থান' (Green Jobs) তৈরি করবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় হবে, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে এবং স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমাবে (বায়ুদূষণ কমার মাধ্যমে)।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান
রিপোর্টটি শেষ করা হয়েছে একটি কড়া বার্তার মাধ্যমে: "দেরি করার মানে হলো খরচ বাড়ানো।" আজ আমরা যদি স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগে অনিচ্ছুক হই, তবে ভবিষ্যতে আমাদের প্রজন্মকে এর চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি মূল্য দিতে হবে, যা হয়তো অর্থ দিয়েও মেটানো সম্ভব হবে না।
এক কথায়, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অর্থ খরচ করা কোনো অপচয় নয়, বরং এটি পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত এবং সস্তা বিনিয়োগ। এটি এমন এক প্রিমিয়াম যা আজ পরিশোধ করলে কাল আমরা একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পৃথিবী পাব।