শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১:১৪, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: অ্যানাদোলু এজেন্সির সৌজন্যে।
খান ইউনিসে ঘরবাড়ি ও প্রিয়জন হারানো পরিবারগুলো ধ্বংসযজ্ঞ আর শোকের মাঝেই ফিরিয়ে আনছে পুরনো ঐতিহ্য। দক্ষিণ গাজার একটি ছয় তলা ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির কংক্রিটের ওপর এখন দুলছে রঙিন হারিকেন, খবর অ্যানাদোলু এজেন্সির।
খান ইউনিসের আবু সুফিয়ান পাড়ায় শিশুরা ভেঙে পড়া দেয়ালের ওপর দিয়ে তার টেনে তাবু ও ধসে পড়া ভবনগুলোর মাঝে আলোকসজ্জা করছে। ইসরায়েলের দুই বছরব্যাপী যুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধবিরতির পর এটিই প্রথম রমজান, যে যুদ্ধে গাজার বিশাল অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এখানকার বাসিন্দাদের কাছে এই সাজসজ্জা কেবল একটি মৌসুমী রীতি নয়, বরং জীবনকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
ধূসর প্রান্তরে রঙের ছোঁয়া
কয়েক মাস ধরে এই এলাকায় কেবল ছাই আর ধুলোর রাজত্ব ছিল। এখন সেখানে বোমাবর্ষণের ক্ষতচিহ্ন থাকা গলিগুলোতে ‘রমজান মোবারক’ এবং ‘স্বাগতম পবিত্র মাস’ লেখা ব্যানার ঝুলছে। ভাঙাচোরা ভবনের ধূসর দিগন্তে লাল ও হলুদ আলো ফুটে উঠছে। এই আলোকসজ্জাগুলো ছোট জেনারেটরের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে যা রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য জ্বলে, তবে এটুকুই তাদের জন্য যথেষ্ট।
পারিবারিক ভিটেমাটির বদলে গড়ে ওঠা তাবুগুলোর মাঝে শিশুরা হাসাহাসি করছে এবং যুদ্ধের ধকল সয়ে টিকে যাওয়া হারিকেন ও আলোর সজ্জা পরীক্ষা করে দেখছে। স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াসির আল-সাত্তারি এই সাজসজ্জার তদারকি করছেন। তিনি বলেন, “সবকিছু ধসে পড়লেও আমাদের এই ঐতিহ্য কখনো থামেনি।”
সাত্তারি যুদ্ধে তার ঘরবাড়ি, স্ত্রী, বোন এবং পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যকে হারিয়েছেন। তবুও তিনি সাজসজ্জার বিষয়ে অনড়। তিনি বলেন, “আমরা চাই না যুদ্ধ আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে রমজানের আনন্দ কেড়ে নিক। তারা ইতিমধ্যে অনেক কিছু হারিয়েছে।”
বেঁচে থাকার লড়াইয়ে গড়া রমজান
গত দুটি রমজান কেটেছে বোমাবর্ষণ আর দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার মধ্য দিয়ে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো ইফতার ও সেহরির জন্য সামান্য খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেয়েছে। এখনো পুরো এলাকা সমতল হয়ে আছে এবং হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ।
তবুও এবারের রমজান শান্ত হলেও এর অর্থ ভিন্ন। সাত্তারি বলেন, “আমরা বেঁচে আছি, আর সেই কারণেই আমরা আনন্দ করছি।”
গাজা জুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইসরায়েল বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও উপত্যকার একমাত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় ৫,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক এবং ২,০০০-এরও বেশি ট্রান্সফরমার ধ্বংস হয়েছে, যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১.৪ বিলিয়ন ডলার।
তবুও রাত নামলে তাবু আর ফাটল ধরা দেয়ালগুলোর ওপর ফানুসগুলো জ্বলে ওঠে। সেই আলো ক্ষীণ, তারগুলো নড়বড়ে এবং রাস্তাগুলো এখনো ভাঙাচোরা। কিন্তু আবু সুফিয়ান পাড়ায় একটি বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট: রমজান আসবেই, এমনকি যদি তাকে ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়েই আসতে হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের দুই বছরের যুদ্ধে ৭২,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত (যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু) এবং ১,৭১,০০০-এরও বেশি আহত হওয়ার পর, গত ১০ অক্টোবর থেকে মার্কিন সমর্থিত একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর রয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ১০ অক্টোবর চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী শেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে শত শত বার এটি লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে আরও ৬০৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,৬১৮ জন আহত হয়েছেন।