শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭:৪৩, ৭ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৫৪, ৭ মার্চ ২০২৬
তেহরান বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে ইস্রায়েল। ছবি: সংগৃহীত।
তেহরান বিমানবন্দরে ইসরায়েলি হামলার মুখেও নতি স্বীকার করতে নারাজ ইরান। শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট এক বক্তব্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার দেশ কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না। এমন এক সময়ে তিনি এই ঘোষণা দিলেন যখন ইসরায়েল তেহরানের একটি প্রধান বিমানবন্দরে অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে, খবর ডেইলী সাবাহ’র।
ভোররাতের এই ইসরায়েলি হামলাগুলো ছিল গত শনিবার শুরু হওয়া বোমাবর্ষণ অভিযানের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম। এবারের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে একটি সামরিক একাডেমি, একটি আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টার এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্র মজুদাগারের নাম উঠে এসেছে। এএফপির ছবিতে তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেছে।
তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বেশ আক্রমণাত্মক সুর বজায় রাখেন। তার এই বক্তব্যটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, যিনি শুক্রবার বলেছিলেন যে একমাত্র ইরানের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণই’ এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে। পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের শত্রুদের উচিত ইরানি জনগণের শর্তহীন আত্মসমর্পণের ইচ্ছাটি কবরে নিয়ে যাওয়া।
পাল্টা জবাব হিসেবে শনিবার ইরানও আক্রমণ চালিয়েছে। জেরুসালেমের পাশাপাশি উপসাগরীয় শহর দুবাই, মানামা এবং রিয়াদের কাছাকাছি বিমান হামলার সতর্কতা ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সৌদি আরব রিয়াদের কাছে একটি বিমান ঘাঁটির দিকে ছোঁড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে, যেখানে মার্কিন সামরিক কর্মীরা অবস্থান করছিলেন। আন্তর্জাতিক যাতায়াতের জন্য বিশ্বের ব্যস্ততম দুবাই বিমানবন্দরটিও ওই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের ঘটনার পর সাময়িকভাবে সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় ‘প্রিমা’ নামক একটি তেল ট্যাংকারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এই প্রণালীটি বিশ্ব নৌ-চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ যা ইরান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। পেজেশকিয়ান অবশ্য তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং বলেছেন যে, তাদের ভূখণ্ড যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহৃত না হয়, তবে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না।
গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পা রাখা এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই লেবানন, গ্রিস, সাইপ্রাস, তুরস্ক এবং আজারবাইজানে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার উপকূল পর্যন্ত এই সংঘাতের রেশ পৌঁছেছে, যেখানে মার্কিন বাহিনী টর্পেডো দিয়ে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে।
ইরানের ভেতরে অবকাঠামো এবং আবাসিক ভবনের ক্ষয়ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে, আর রাজধানীর বাসিন্দারা জানাচ্ছেন যে সেখানে চরম উদ্বেগ এবং রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি বিরাজ করছে।
"যারা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করেনি, তারা এটি বুঝবে না," এএফপির কাছে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ২৬ বছর বয়সী একজন আতঙ্কিত শিক্ষক বলেন। "যখন আপনি বোমার শব্দ শুনবেন, তখন আপনার কোনো ধারণাই থাকবে না যে সেগুলো কোথায় আঘাত হানবে।"
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুক্রবার পর্যন্ত ৯২৬ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর খবর দিয়েছে এবং প্রায় ৬,০০০ মানুষ আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে, তবে এএফপি স্বাধীনভাবে এই সংখ্যার সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
ইসরায়েল লেবাননেও তাদের বিমান হামলা জোরদার করেছে। বিশেষ করে বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ দক্ষিণ শহরতলিতে বারবার হামলা চালানো হচ্ছে এবং বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ২১৭ জন নিহত হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সতর্ক করেছেন যে একটি "মানবিক বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে"। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের তথ্যমতে, প্রাণহানি ছাড়াও দেশটির প্রায় ৩,০০,০০০ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
তবে এই সংঘাতের প্রভাব সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও অনেক দূরে পৌঁছেছে। বিশ্ব শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না, যা মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে এক মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যিনি এই যুদ্ধ শুরুর পেছনে বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন, তেহরানের সাথে নতুন করে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ তিনি লেখেন, "শর্তহীন আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সাথে কোনো চুক্তি হবে না।"
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, যখন প্রেসিডেন্ট মনে করবেন যে ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয় এবং অভিযানের লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে, তখন "ইরান কার্যত শর্তহীন আত্মসমর্পণের অবস্থানে থাকবে, তারা সেটি মুখে স্বীকার করুক বা না করুক।"
ট্রাম্প তেহরানে তার কাছে "গ্রহণযোগ্য" কাউকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দিলে দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি বলেছেন, খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকবে না। তিনি যোগ করেন, "ইরানের নেতৃত্ব নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ আমাদের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী এবং কেবল ইরানি জনগণের ইচ্ছায়, কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়াই।"
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরান পাল্টা হামলা চালালেও, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শুক্রবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে এক ফোনালাপে "অবিলম্বে" যুদ্ধবিরতির পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানিয়েছেন যে, রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সেনাদের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য দিচ্ছে এমন খবরে যুক্তরাষ্ট্র "উদ্বিগ্ন নয়"। সিবিএস-এর '৬০ মিনিটস' অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "আমরা সবকিছুর ওপর নজর রাখছি।"
এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। শনিবার ডেলাওয়্যারের ডোভার বিমান ঘাঁটিতে তাদের মরদেহ হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।