শিরোনাম
বিবিসি নিউজ বাংলা
প্রকাশ: ১৯:১৮, ৭ মার্চ ২০২৬
সউদি আরবে বাংলাদেশের কর্মী। ফাইল ছবি, সংগৃহীত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরুর পর ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরব তেল সমৃদ্ধ কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
হামলার অংশ হিসেবে ইরান তার আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে যাচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে। এসব হামলায় ওই সব দেশের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বেসামরিক ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
হামলার শিকার হচ্ছে ভ্রমণ, পর্যটন ও আর্থিক কেন্দ্র ছাড়াও তেল ও গ্যাস শিল্প স্থাপনা, যেখানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বিপুল শ্রমিক কাজ করেন।
বাংলাদেশের সরকারি সংস্থাগুলোর হিসেবে, গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) ছয়টি দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ ছয়টি দেশেরই বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ইতোমধ্যেই এক বা একাধিকবার হামলা চালিয়েছে ইরান।
এখনো যুদ্ধ শেষ বা স্থগিত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সাথে কোনো আলোচনায় যাবেন না তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা প্রবাসীদের দেশে থাকা পরিবারে বাড়ছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এমন কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তাদের স্বজনদের নিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত দুজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছে।
এর মধ্যে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন করে বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আবার কুয়েতে ড্রোন হামলার ঘটনায় অন্তত ৪ বাংলাদেশি আহত হয়েছেন।
পরিবার ও স্বজনরা কী বলছে
প্রবাসীদের পরিবারের সদস্য কিংবা তাদের স্বজনরা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তারা তাদের মধ্যপ্রাচ্যে থাকা স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
লক্ষ্মীপুরের ফাতেমা বেগমের স্বামী মাহে আলম ওমানে থাকেন আট বছর ধরে। তিনি বলছেন, তার স্বামীর সাথে সবশেষ কথা হয়েছে শুক্রবার।
"ওনারা যেখানে থাকেন তার কাছেই বোমা পড়েছে। কিন্তু তারা কাজে যেতে পারে নাই। ভয়ের মধ্যে আছে। কাল জানিয়েছে খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। এগুলো শুনলে কি আর সুস্থ থাকা যায় বলেন? আমরা চিন্তায় শ্যাষ হওয়ার মতো অবস্থা," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
একই জেলার এন এস রায়হানের ছোট ভাই থাকেন ওমানের মাস্কটে আর শ্যালক থাকেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে।
"ওদের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। ওরা জানিয়েছে যে তারা ঠিক যেখানে থাকে সেখানে এখনো কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু আসলে এটা তো যুদ্ধ। ওরা যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি আমরাও এখানে থেকে চরম উদ্বেগের মধ্যে আছি। প্রতি মুহূর্তেই টেনশন করছে পরিবারের সবাই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
ভোলার লালমোহনের চরভূতা ইউনিয়নের মোশাররফ হোসেন শিপলুর দুই ভাই থাকেন সৌদি আরবের রিয়াদে। তিনি জানান, তার ভাইয়েরা যেখানে থাকেন সেখানে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।
"কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ না হলে অনিশ্চয়তা উৎকণ্ঠা তো থেকেই যায়। আশা করি ইনশাল্লাহ দ্রুতই যুদ্ধ শেষ হবে," বলছিলেন তিনি।
ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার রাণীখার গ্রামের ওয়াসিম জজ মিয়ার ছোটো ভাই বাহরাইনের মানামায় থাকেন গত পনের বছরেরও বেশি সময় ধরে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ভাইকে নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় তাদের পরিবারের দিন কাটছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
"এখানে পরিবারের সবাই আছে। তার ছেলে মেয়েরাও এখানেই আছে। পরশু দিনও জানিয়েছে যে তারা নিরাপদে আছে। কিন্তু আমাদের সবার জন্যই তো টেনশন হয়," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. ওয়াসিম।
কুমিল্লার লাঙ্গলকোটের মুন্নি আক্তারের স্বামী হাফিজুল ইসলাম সৌদি আরবের জেদ্দায় থাকেন প্রায় তিন বছর ধরে।
মিজ আক্তার বলছেন, "দুই দিন আগে ওনাদের ওখানে এমন অবস্থা হয়েছিল যে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছে। আমরা তো বাচ্চাকাচ্চাসহ টেনশনে পড়ে গেছি। আল্লাহই জানে কী হয়"।
উদ্বেগ আছে কাজ ও ভিসা নিয়েও
অনেক পরিবার মনে করছে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নিরাপত্তা সমস্যা প্রকট হয়ে উঠতে পারে এবং তার জের ধরে অনেককে দেশেও ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারে।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসেবে চলতি অর্থ বছরে এখন পর্যন্ত যত প্রবাসী আয় এসেছে তার প্রায় ৪৫ শতাংশই এসেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের ওই ছয় দেশ থেকে।
এর মধ্যে সরকারি হিসেবে সৌদি আরবেই আছে প্রায় ২০ লাখ আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছে ১০ লাখ বাংলাদেশি। এছাড়া ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখের বেশি এবং বাহরাইন ও কুয়েতে দেড় লাখ করে বাংলাদেশি আছে।
আবার যুদ্ধ শুরুর পর অনেকে দেশে এসে আটকা পড়ে ভিসার মেয়াদ হারানোর আশংকায় পড়েছেন।
এর মধ্যে কাতার সরকার এ ধরনের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
এছাড়া ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা, পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন এবং সামরিক স্থাপনা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে ৬ দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস।
দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে একই সঙ্গে দেশগুলোর আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ওইসব দেশের সরকারের বিবৃতি বা নির্দেশনা অনুযায়ী চলার অনুরোধ করা হয়।
"আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করার দৃশ্য, বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা, সামরিক অভিযান, সামরিক ঘাঁটি, সামরিক যানবাহনের চলাচল কিংবা এ ধরনের সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি বা ভিডিও ধারণ করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত ছবি বা ভিডিও আপলোড করা, অথবা ভিত্তিহীন কোনো সংবাদ প্রচার না করতে'' ওই সব দেশের সরকারের যে নির্দেশনা সেগুলো সব বাংলাদেশিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস।
এছাড়া বিপদ কেটে না যাওয়া পর্যন্ত খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া, খোলা আকাশের নিচে না যাওয়া এবং অযথা জমায়েত না হতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি পরিস্থিতি বিবেচনায় নগদ টাকা, আইডি, পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ওষুধ, মোবাইল চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক, পানি ও শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সবসময় নিজের সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।
এদিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শনিবার সিলেটে এক অনুষ্ঠানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হওয়ার প্রেক্ষাপটে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে বলেছেন, প্রবাসীদের সহায়তার জন্য প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি হটলাইন চালু করেছে এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সিভিল এভিয়েশন আমরা যৌথভাবে কাজ করছি।
"মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে সরকার সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করবে। প্রবাসীদের যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ," বলেছেন তিনি।