শিরোনাম
বাসস
প্রকাশ: ১৪:০৫, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: বাসস।
উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সারাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ চলছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও ভোর থেকেই গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে ভোটারদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্রগুলোতে বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেছে। অনেকেই সপরিবারে ভোট দিতে আসেন। প্রথমবারের মতো ভোট দিয়ে তরুণ ভোটাররা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকে জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের পর এবারই তারা ভোটকেন্দ্রে এসেছেন।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটাররা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিচ্ছেন। কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি বুথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, '১৭-১৮ বছর পর ভোট দিলাম। খুব ভালো লাগছে। পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর, কোনো সমস্যা নেই।'
একই কেন্দ্রে প্রথমবারের মতো ভোট দেন সামিয়া। তিনি বলেন, 'প্রথম ভোট দিলাম, খুব ভালো লাগছে। পরিবেশ ভালো, ভোট দেওয়া সহজ ছিল। যারা নির্বাচিত হবেন, তারা যেন মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করেন।'
সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জানান, শুরুতে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি বুথে সিসি ক্যামেরা রয়েছে বলে তিনি জানান।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে সপরিবারে ভোট দেন। তিনি বলেন, 'দীর্ঘ চাকরি জীবনে ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। এবার প্রথমবার ভোট দিলাম। নির্বাচন সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।'
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাসসকে জানান, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। তিনি ভোটারদের উৎসবমুখর পরিবেশে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন বাতিল হওয়ায় সেখানে ভোট হচ্ছে না।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ভোটারদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, 'ভোটদান শুধু নাগরিক অধিকার নয়, এটি একটি দায়িত্ব।' তিনি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
তিনি জানান, যেকোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচন উপলক্ষে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার
সেনাসদস্য, ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ পুলিশ সদস্য, ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ আনসার ও ভিডিপি সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ বিজিবি সদস্য, ৯ হাজার ৩৪৯ র্যাব সদস্যসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা।
প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ইউএভি (ড্রোন) ও বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে।
দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলছে। মোট ভোটকক্ষ রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ৫০টি রাজনৈতিক দল। মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৮ জন—দলীয় ১ হাজার ৭৫৫ জন ও স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮৩ জন।
মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ১ হাজার ২৩২ জন।
সর্বনিম্ন ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে (২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১) এবং সর্বোচ্চ গাজীপুর-২ আসনে (৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩)।
নির্বাচনে ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জন পর্যবেক্ষকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন।
পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন করেছেন মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার। এর মধ্যে প্রবাসী ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন এবং দেশের অভ্যন্তরে ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন। ইতোমধ্যে ৫ লাখ ৩১ হাজার ২১৪ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন।
ভোটগ্রহণের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ রয়েছে।
নির্বাচন উৎসবে পরিণত হয়েছে : জামায়াত
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, এবারই প্রথম ভোট সুন্দর, উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান।
আজ বৃহস্পতিবার মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সারা দেশে একটি প্রাণবন্ত এবং সর্বজনীন পরিবেশ বিরাজ করছে। সব বয়স ও পেশার মানুষ ভোটে অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচন এখন একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে।
জুবায়ের জানান, সরকারের সাধারণ ছুটির ঘোষণা ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। মিডিয়া প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিপুল সংখ্যক ভোটার পুরুষ, মহিলা ও বিশেষ করে যুবক-তরুণরা ভোট কেন্দ্রের সামনে সুন্দরভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। জাতীয় সংসদের ২৯৯টি আসনে ভোট হচ্ছে, অর্থাৎ ২৯৯ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। ফলাফল আজ রাত বা আগামীকাল জানা যাবে। এ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রস্তাব।
জুবায়ের ভোটারদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “আমরা দৃঢ় বিশ্বাস করি জনগণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উভয়েই মহাভোটে বিজয়ী হবেন।”
জুবায়ের বলেন, “সব দিক বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক দুই-দেড় দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট প্রদান। নতুন প্রজন্ম এই অংশগ্রহণমূলক ভোটের অভিজ্ঞতা প্রথমবার পাচ্ছে। আমাদের জেনজিরা, মা ও বোনেরা সবাই বিপুলভাবে অংশগ্রহণ করছেন।”
তবে তিনি অভিযোগ করেন, ভোলা. কুমিল্লা, বরগুনা ও নোয়াখালীর কিছু কেন্দ্রে নেতৃবৃন্দ ও এজেন্টদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
জুবায়ের নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও তৎপর থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করছে।