শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১:১০, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১১:১০, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পরিবেশ বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান লুই জেনসেন। ছবি: ইউরো নিউজের সৌজন্যে।
গ্রিনল্যান্ডের চারপাশ কায়াকিং করে ঘুরে বেড়ানো একজন ইনুইট বিজ্ঞানীর গল্প এটি, যার লক্ষ্য হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক কতটা দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে তা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।
খুবই প্রত্যন্ত অঞ্চলের হিমবাহগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার উন্মোচন করার মিশনে নেমেছেন ক্রিস্টিয়ান লুই জেনসেন। গত এক দশক ধরে কেবল একটি কায়াক এবং নিজের তৈরি একটি মাইক্রোপ্লাস্টিক ফিল্টার নিয়ে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, খবর ইউরো নিউজের।
পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে মাস্টার্স করার সময় জেনসেন ‘দ্য প্লাস্টাক’ (The Plastaq) নামে একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। এটি একটি সিটিজেন-সায়েন্স টুল, যার মাধ্যমে কায়াক চালক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা পরিত্যক্ত বোতল বা প্যাকেজিংয়ের মতো বর্জ্যযুক্ত পানির নমুনা সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু তার এই কাজ তাকে মানবতার ‘অদৃশ্য পদচিহ্ন’ নিয়ে আরও গভীর প্রশ্ন তুলতে উৎসাহিত করে, যা তাকে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের এক নির্জন হিমবাহে পৌঁছে দেয়।
জেনসেন আর্কটিকের এমন এক কোণে কায়াকিং করেছেন যা নিকটতম কোনো রাস্তা থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে। তিনি সেখানে প্লাস্টিক তন্তু বা সাধারণ বর্জ্য পাওয়ার আশা করেছিলেন এবং তা পেয়েওছেন। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল তার সংগৃহীত নমুনায় গাড়ির টায়ারের কণা খুঁজে পাওয়া।
জেনসেনের মতে, গ্রিনল্যান্ডের একটি নির্মল হিমবাহে এসব কণা পাওয়া একটি ভয়াবহ সত্যকে প্রমাণ করে। এটি এখন আর কেবল শহরের সমস্যা নয়; এই কণাগুলো ধূলিকণায় পরিণত হয়ে বাতাসে মিশে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আর্কটিক পর্যন্ত চলে এসেছে। তিনি একে ‘গতিশীল জীবাশ্ম জ্বালানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে আর্কটিক এখন বিশ্বের দূষণের একটি বিশাল আধার বা ‘সিঙ্ক’-এ পরিণত হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় পাঁচ বিলিয়নের বেশি টায়ার রাস্তায় চলছে এবং প্রতিটি টায়ার তার জীবনচক্রে প্রায় ১০ থেকে ৩০ শতাংশ ভর হারিয়ে ফেলে। জেনসেন বলেন, এই ভর অদৃশ্য হয়ে যায় না, বরং বিষাক্ত ধূলিকণায় পরিণত হয়ে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের একদম শুরুতেই আস্তরণ তৈরি করে।
জেনসেনের এই গবেষণা গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য তিনটি বড় সমস্যার দিকে আঙুল তুলেছে। পরিবেশগতভাবে দেখা যাচ্ছে যে, টায়ারের বিষাক্ত উপাদান আর্কটিকের প্রাণীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। উদাহরণস্বরূপ, ‘6PPF’-এর মতো রাসায়নিক কোহো স্যামন মাছের জন্য মারাত্মক। এছাড়া টায়ার দূষণ আটলান্টিক কড মাছের ডিমে বিকৃতি ঘটাতে পারে, যা দেশটির মৎস্য শিল্পের ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলছে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য গ্রিনল্যান্ডের এই দূষিত পানি এখন পরিবেশগত ন্যায়বিচারের লড়াই এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা মূলত 'পাইপের শেষ প্রান্তে' দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে অন্য মহাদেশে চলা যানবাহনের দূষণ আমরা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করছি এবং খাচ্ছি।
শহরাঞ্চলে এই ধরনের কণার দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শ ইতিমধ্যে হাঁপানি এবং হৃদরোগের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জেনসেন বলেন, "আর্কটিক অঞ্চলে এই হুমকি এখন আমাদের খাদ্যের ওপর ভর করছে এবং একটি নির্মল পরিবেশকে বৈশ্বিক বর্জ্যের ভাণ্ডারে পরিণত করছে। উচ্চ অক্ষাংশের মানুষরা বৈশ্বিক দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আনুপাতিকভাবে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।"
জলবায়ু নীতিমালার 'মারাত্মক অন্ধবিন্দু'
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান মাইক্রোপ্লাস্টিক সমস্যা নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, মহাসাগরের আবর্জনার স্তূপের চেয়েও এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের সামুদ্রিক বরফে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব অনেক বেশি।
জেনসেনের মতে, জলবায়ু নীতিমালায় একটি 'মারাত্মক অন্ধবিন্দু' বা ঘাটতি রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, "বর্তমানে আমরা কেবল যানবাহনের ধোঁয়া নির্গমন (টেইলপাইপ) নিয়ন্ত্রণ করি, কিন্তু টায়ার থেকে কী ক্ষয়ে পড়ছে তা উপেক্ষা করি। অথচ বিশ্বব্যাপী বাস্তুসংস্থানে প্রবেশকারী মাইক্রোপ্লাস্টিকের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে এখন টায়ার কণাকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।"
টায়ার দূষণ ও জীবাশ্ম জ্বালানি
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বিষয়টি গত COP30 সম্মেলনে বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল, যেখানে ৯০টিরও বেশি দেশ একটি রোডম্যাপের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল। তবে প্রভাবশালী তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বাধার মুখে চূড়ান্ত চুক্তি থেকে 'ফেজ-আউট' বা সম্পূর্ণ বন্ধের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। এখন জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত ভবিষ্যতের আশা টিকে আছে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য গ্লোবাল ফসিল ফুয়েল ফেজ-আউট কনফারেন্সের ওপর।
জেনসেন বলেন, এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি মূলত 'ব্ল্যাক কার্বন' বা জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত ধোঁয়ার ওপর আলোকপাত করে। কিন্তু আমাদের উচিত 'কার্বন ব্ল্যাক' (Carbon Black)-কেও এর অন্তর্ভুক্ত করা, যা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পাওয়া একটি উপাদান এবং প্রতিটি টায়ারের একটি বিশাল অংশ জুড়ে থাকে। তার ভাষায়, "আমাদের যানবাহনের নিচে থাকা কঠিন পেট্রোকেমিক্যালগুলোকে উপেক্ষা করে আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি সংকট মোকাবিলার দাবি করতে পারি না।"
উত্পাদনকারীদের স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়ে জেনসেন একটি 'সহযোগিতামূলক ইকোসিস্টেম' তৈরির আহ্বান জানান, যেখানে বিষবিজ্ঞানীরা আধুনিক টায়ার তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক মিশ্রণগুলো সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পাবেন।
'ব্ল্যাক কার্বন' জোট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
একা বিশাল কর্পোরেশনগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন, তাই জেনসেন এই মাসে আর্কটিক ফ্রন্টিয়ার্স কনফারেন্সে 'ব্ল্যাক কার্বন সায়েন্টিফিক কোয়ালিশন' চালু করছেন। এই জোটের মূল কাজ হবে আর্কটিক অঞ্চলে ব্ল্যাক কার্বন এবং কার্বন ব্ল্যাকের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা।
এই জোটে বিষবিজ্ঞানী, আদিবাসী নেতা এবং নীতিনির্ধারকরা একসাথে কাজ করবেন। তারা সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং এই বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য COP31-এ উপস্থাপন করবেন। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো টায়ার কণা নির্গমন কমাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করা।
জেনসেনের এই দীর্ঘ সংগ্রাম ও গবেষণার গল্প খুব শীঘ্রই বড় পর্দায় দেখা যাবে। পুরস্কার বিজয়ী জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা স্টিফেন ক্রোনসের পরিচালনায় 'Black Carbon' নামক একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণাধীন রয়েছে, যা আর্কটিকের ভঙ্গুর বাস্তুসংস্থান এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিধ্বংসী প্রভাব তুলে ধরবে।