শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩:২১, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের করা একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের চরম তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হওয়া মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে। এই চরম তাপমাত্রার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম হবে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
প্রকৃতি এবং পরিবেশ সংক্রান্ত খ্যাতনামা জার্নাল 'নেচার সাসটেইনেবিলিটি'-তে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা একে একটি জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, যদি বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়—যা বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী আগামী ২৫ বছরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—তবে প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের শিকার হবে। উল্লেখ্য যে, ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী ২০৫০ সালে এই সংখ্যাটি ১৫৪ কোটি হওয়ার কথা ছিল।
চরম তাপপ্রবাহ বলতে বোঝায় অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়ার একটি সময়কাল, যেখানে তাপমাত্রা টানা কয়েক দিন ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে, খবর টেলিগ্রাফ ইন্ডিযার।
গবেষণার প্রধান লেখক জেসুস লিজানা জানিয়েছেন যে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ফিলিপাইন—এই দেশগুলোর বিশাল জনসংখ্যা চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করবে এবং তারা ৩,০০০-এর বেশি 'কুলিং ডিগ্রি ডেস' (CDD) প্রত্যক্ষ করবে। কুলিং ডিগ্রি ডেস হলো ঘরের ভেতরের পরিবেশ নিরাপদ ও ঠান্ডা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির একটি পরিমাপ। ৩,০০০-এর বেশি CDD-র অর্থ হলো তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী বার্ষিক গরম।
লিজানা আরও উল্লেখ করেছেন যে, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার আগেই শীতলীকরণ এবং গরম করার চাহিদায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই অনেক বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার লাগানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু গ্লোবাল ওয়ার্মিং যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি চলতেই থাকবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং এই গবেষণার সহ-লেখক রাধিকা খোসলা বলেন, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণতা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অভিবাসন এবং কৃষিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নজিরবিহীন প্রভাব ফেলবে। এই ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো নেট-জিরো বা কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি থেকে ২ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে বিশ্বের তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ১.৫ ডিগ্রির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চরম শীতল অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও ১৪ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নেমে আসবে।
গবেষণাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জানিয়েছে যে ভারত বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চরম তাপপ্রবাহের মুখে পড়বে। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার ওপর এর প্রভাব মোকাবিলা করতে এখনই লক্ষ্যভিত্তিক অভিযোজন এবং সুরক্ষামূলক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
হায়দ্রাবাদের ইন্ডিয়ান স্কুল অফ বিজনেসের অধ্যাপক এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আঞ্জল প্রকাশ বলেন, “অক্সফোর্ডের এই গবেষণাটি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সংকটময় সন্ধিক্ষণকে চিহ্নিত করেছে। যদি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমানো না যায়, তবে চরম তাপপ্রবাহ—যা ইতিমধ্যেই প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে—২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমান বিশ্ব জনসংখ্যার দ্বিগুণ মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, বিশেষ করে ভারতের মতো দেশগুলোতে।”
তিনি আরও বলেন, “অধিক জনসংখ্যা এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর এই অঞ্চলগুলোতে স্বাস্থ্য, কৃষি এবং অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকি তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক বৈষম্যকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান লেখক আঞ্জল প্রকাশ সতর্ক করে বলেন যে, ভারতের উত্তর অংশে তাপপ্রবাহের কারণে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। তাঁর মতে, এখনই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, গ্রিন ফাইন্যান্স বা পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন এবং জলবায়ু সম্মেলন বা কপ-এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাম্যভিত্তিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। যেকোনো বিলম্ব অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আবহাওয়া দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠার ফলে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস এবং ব্রাজিলে ঘর ঠান্ডা রাখার বা শীতলীকরণের চাহিদা মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, কানাডা, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং নরওয়েতে ঘর গরম রাখার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি কমে আসবে।