শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯:৫৯, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৯:৫৯, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের সৌজন্যে।
কৃত্রিম ফুসফুস একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে ৪৮ ঘণ্টা বাঁচিয়ে রেখেছে—যতক্ষণ না তিনি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত হয়ে ওঠেন। জীবনরক্ষাকারী এই যন্ত্রটির কল্যাণে প্রায় তিন বছর পর বর্তমানে ওই রোগী বেশ সুস্থ আছেন।
বেঁচে থাকার জন্য মানুষের রক্তে অক্সিজেন সঞ্চালনের জন্য অন্তত একটি সচল ফুসফুস প্রয়োজন। কিন্তু ৩৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ৪৮ ঘণ্টা কোনো ফুসফুস ছাড়াই শুধুমাত্র কৃত্রিম ফুসফুসের সাহায্যে বেঁচে ছিলেন। ২০২৩ সালের বসন্তে শিকাগোর নর্থওয়েস্টার্ন মেমোরিয়াল হাসপাতালে যখন ওই রোগীকে আনা হয়, তখন তিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এবং নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ফলে তার ফুসফুসে তরল জমে যাচ্ছিল এবং সেগুলো অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারছিল না। চিকিৎসকদের ভাষায়, তার ফুসফুসগুলো তরলে পরিণত হচ্ছিল, খবর স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের।
গবেষণার সহ-লেখক এবং থোরাসিক সার্জন অঙ্কিত ভারত জানান যে, রোগীর অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছিল না এবং তিনি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছিলেন। তার কিডনি অকেজো হতে শুরু করেছিল এবং হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা সিপিআর দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখলেও বুঝতে পারছিলেন যে দ্রুত বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে।
চিকিৎসকদের সামনে তখন এক কঠিন পরিস্থিতি—রোগীর ফুসফুস দুটি সংক্রমণের মূল উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু তিনি তখন এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব ছিল না। ফলে তারা তার ফুসফুস দুটি সরিয়ে ফেলেন এবং সেখানে একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা স্থাপন করেন। এই যন্ত্রটি হৃদপিণ্ডের ডান দিক থেকে রক্ত টেনে নিয়ে তাতে অক্সিজেন যুক্ত করত এবং পুনরায় হৃদপিণ্ডের বাম দিকে পাঠিয়ে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন সচল রাখত। অঙ্কিত ভারত ও তার দল মূলত কোভিড রোগীদের জন্য এই ব্যবস্থাটি নিয়ে কাজ করছিলেন।
এই প্রক্রিয়ার পর রোগীর অবস্থায় দ্রুত উন্নতি ঘটে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার রক্তচাপ স্বাভাবিক করতে কোনো ওষুধের প্রয়োজন হয়নি, কিডনি সম্পূর্ণ সচল হয়ে যায় এবং হৃদপিণ্ড স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে শুরু করে। তখন তিনি ডাবল লাং ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা জোড়া ফুসফুস প্রতিস্থাপনের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠেন। সফল অস্ত্রোপচারের তিন বছর পর ওই রোগী এখন চমৎকার জীবনযাপন করছেন।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টমিড হাসপাতালের ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিশেষজ্ঞ নাতাশা রজার্স নেচার পত্রিকাকে বলেছেন যে, এই কৃত্রিম ফুসফুস ব্যবস্থার পেছনের প্রকৌশল অত্যন্ত বিস্ময়কর। বর্তমানে ইসিএমও (ECMO) নামক প্রযুক্তি ফুসফুসের গ্যাস বিনিময়ের কাজ করতে পারলেও, রজার্স ব্যাখ্যা করেন যে এই নতুন সিস্টেমটি ইসিএমও-র একটি উন্নত সংস্করণ যা হৃদপিণ্ডে রক্ত প্রবাহকেও সচল রাখতে সক্ষম।
তাছাড়া, এই গবেষণাটি ফুসফুসে অতিরিক্ত তরল জমার চরম অবস্থা, যাকে এআরডিএস (ARDS) বলা হয়, তার প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি যে যথেষ্ট নয় সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অঙ্কিত ভারত এক বিবৃতিতে বলেন যে, সাধারণত মানুষ মনে করে গুরুতর এআরডিএস হলে রোগীকে কৃত্রিম সহায়তা দিয়ে গেলে এক সময় ফুসফুস সেরে উঠবে। কিন্তু গবেষকরা যখন ওই ৩৩ বছর বয়সী রোগীর ফুসফুস বিশ্লেষণ করেন, তখন তারা দেখেন যে অঙ্গগুলো এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে তা আর কখনোই স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার মতো ছিল না। তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রথমবারের মতো আণবিক প্রমাণের মাধ্যমে আমরা এটি দেখালাম যে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে জোড়া ফুসফুস প্রতিস্থাপন ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
অঙ্কিত ভারত সায়েন্টিফিক আমেরিকানকে জানিয়েছেন যে, তিনি আশা করেন অন্যান্য চিকিৎসকরাও অত্যন্ত সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে এই ফুসফুস ব্যবস্থাকে একটি চূড়ান্ত বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করবেন। তিনি বলেন যে, এই গবেষণাপত্রে আমরা আমাদের অর্জিত সব শিক্ষা, যন্ত্রটির বিন্যাস এবং এর পেছনের যুক্তিগুলো বর্ণনা করেছি যা যে কেউ অনুসরণ করতে পারবে। এর কোনো পেটেন্ট বা স্বত্বাধিকার আমরা নিজেদের কাছে রাখিনি।
নেচারকে তিনি জানান যে, আপাতত তারা নর্থওয়েস্টার্ন হাসপাতালে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের এই সেবা প্রদান করবেন এবং একটি রেজিস্ট্রি বা তালিকা সংরক্ষণ করবেন যাতে এই পদ্ধতির ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা যায়।