শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১:০৩, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
টেকনিয়ন-ইসরায়েল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির বায়োটেকনোলজি এবং খাদ্য প্রকৌশল অনুষদের অধ্যাপক বোয়াজ মিজরাহি। সৌজন্যে: টাইম্স অব ইস্রায়েল।
ইসরায়েলি গবেষকরা শরীরের ভেতরেই ওষুধ তৈরির এক অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।
টেকনিওন-ইসরায়েল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির বিজ্ঞানীদের এই অগ্রগামী পদ্ধতিতে জীবিত এবং ক্ষতিকারক নয় এমন ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শরীরের ভেতরে ক্ষুদ্র কারখানার মতো কাজ করে এবং যেখানে প্রয়োজন ঠিক সেখানেই প্রয়োজনীয় থেরাপিউটিক প্রোটিন তৈরি করে।
ইঁদুরের ওপর পরিচালিত এই গবেষণাটি ইতিমধ্যে পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, মাইক্রোনিডল প্যাচ ব্যবহার করে উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি যুদ্ধক্ষেত্রে সৃষ্ট ক্ষত, ডায়াবেটিস এবং ত্বকের প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, খবর টাইমস অব ইস্রায়েলের।
টেকনিওনের বায়োমেটেরিয়াল ল্যাবরেটরির অধ্যাপক বোয়াজ মিজরাহি বলেন, আমরা সাধারণত অভ্যস্ত যে ওষুধ কোনো কারখানায় তৈরি হবে এবং তারপর ক্যাপসুল বা ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো হবে। কিন্তু এই পদ্ধতিটি ওষুধ উৎপাদন এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত হতে পারে।
এই গবেষণার প্রধান গবেষক ড. আদি গ্রস জানান, প্রোটিন বিভিন্ন ধরনের ওষুধে ব্যবহৃত হয়। যেমন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ইনসুলিন এক ধরনের প্রোটিন। আবার কিডনি রোগীদের লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্যকারী হরমোন, অ্যান্টিবডি এবং গ্রোথ হরমোনও প্রোটিন দিয়ে তৈরি।
অধ্যাপক মিজরাহি ব্যাখ্যা করেন যে, প্রোটিন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর গঠন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, যদি প্রোটিনজাতীয় ওষুধ মুখে খাওয়া হয়, তবে পাকস্থলী এবং অন্ত্র সেগুলোকে খাবার হিসেবে গণ্য করে ভেঙে ফেলে, যার ফলে ওষুধটি আর কার্যকর থাকে না। এই নতুন পদ্ধতিটি সরাসরি শরীরের ভেতরে প্রোটিন তৈরির মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধান করবে।
গবেষকদের এই নতুন পদ্ধতিটি শরীরের ভেতরেই নিখুঁতভাবে গঠিত এবং ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত প্রোটিন তৈরি ও নিঃসরণ করতে সক্ষম।
ইঁদুরের ওপর সফল পরীক্ষার পর এই গবেষণাটি 'অ্যাডভান্সড হেলথকেয়ার ম্যাটেরিয়ালস' নামক একটি পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পিএইচডি শিক্ষার্থী ক্যারোলিন হ্যালি আলপেরোভিৎস এই গবেষণার সহ-পরিচালক ছিলেন এবং এতে সহায়তা করেছে ইসরায়েল সায়েন্স ফাউন্ডেশন ও টেকনিওনের রাসেল বেরি ন্যানোটেকনোলজি ইনস্টিটিউট।
অধ্যাপক মিজরাহি বলেন, এই প্রযুক্তিটি মারাত্মক দহন, যুদ্ধের ক্ষত, ডায়াবেটিক ক্ষত এবং সোরিয়াসিসের মতো ত্বকের প্রদাহজনিত রোগের ক্ষেত্রে এক নতুন ধরনের চিকিৎসার পথ খুলে দেবে।
ব্যাকটেরিয়ার গুরুত্ব মিজরাহি জানান, তার ল্যাব প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করে। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক্যালি মডিফাইড বা কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ক্যানসার, বিপাকীয় ব্যাধি এবং অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসার উপায় খুঁজছেন।
তাদের আগের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা 'লিভিং ম্যাটেরিয়ালস' পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি মাইক্রোনিডল প্যাচ সিস্টেম তৈরি করেছিলেন, যা ত্বকের ভেতরে প্রয়োজনীয় বড় অণু বা পলিমার তৈরি করতে পারত। সেই পদ্ধতিটিই বর্তমান গবেষণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। মিজরাহি বলেন, আমাদের এমন কিছুর প্রয়োজন ছিল যা শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধের উপাদান তৈরি ও নিঃসরণ করতে পারে।
এই গবেষণার জন্য ইসরায়েলি বিজ্ঞানীরা 'ব্যাসিলাস প্যারালাইকেনিফরমিস' নামক একটি ক্ষতিকারক নয় এমন ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করেছেন। তারা এটিকে এমনভাবে প্রকৌশল করেছেন যাতে এটি 'গামা-পিজিএ' (γ-PGA) নামক প্রোটিন তৈরি করতে পারে। এই প্রোটিনটি ক্ষত নিরাময় এবং প্রদাহ কমানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্যাকটেরিয়াগুলো শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা বিশেষ এক ধরনের মাইক্রোনিডল প্যাচ তৈরি করেছেন। মিজরাহি একে একটি সাধারণ 'ব্যান্ড-এইড'-এর সাথে তুলনা করেছেন। এই প্যাচটি যখন ত্বকে লাগানো হয়, তখন এর ক্ষুদ্র সূঁচগুলো ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে এবং এরপর নিজে থেকেই গলে যায়। এতে স্নায়ু বা রক্তনালীর কোনো ক্ষতি হয় না।
(বোয়াজ মিজরাহির জৈব পদার্থের গবেষণাগারের ল্যাব ম্যানেজার ডঃ আদি গ্রস। )

গবেষক ড. গ্রসের মতে, শরীরের ভেতরে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো একটি কারখানার মতো কাজ শুরু করে এবং ঠিক যেখানে প্রয়োজন সেখানেই প্রোটিন নিঃসরণ করে। রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, ব্যাকটেরিয়াগুলো অত্যন্ত বিশুদ্ধ এবং কার্যকর ওষুধ তৈরি করছে।
গবেষণাগারে পরীক্ষার সময় দেখা গেছে যে ইঁদুরগুলোর ত্বক সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। প্যাচটি মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে গলে গিয়েছিল এবং শরীরে কোনো ধরনের প্রদাহ বা টিস্যুর ক্ষতির লক্ষণ পাওয়া যায়নি।
ভবিষ্যতে রোগীরা এই প্যাচটি অনেকটা 'স্টিকারের' মতো ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক মিজরাহি। তিনি বলেন, এতে কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না এবং ইনজেকশনের মতো এটি প্রয়োগ করতে কোনো চিকিৎসাকর্মীর প্রয়োজন নেই।
বিশাল সুবিধা প্রচলিত ওষুধের তুলনায় এই নতুন প্রযুক্তির বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা রয়েছে। মিজরাহি বলেন, আক্রান্ত অঙ্গটি সবসময় একদম সতেজ প্রোটিন পাবে কারণ সেগুলো শরীরের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে। এটি একটি বিশাল সুবিধা। যেহেতু কিছু প্রোটিন শরীর শোষণ করতে পারে না এবং কিছু প্রোটিন বাতাসের সংস্পর্শে এলে কার্যকারিতা হারায়, এই পদ্ধতিটি সেই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
গবেষকদের মতে, যেহেতু ব্যাকটেরিয়া টিস্যুর ভেতরে বংশবৃদ্ধি করে, তাই নির্দিষ্ট অঙ্গে একবার ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করালে তা কয়েকদিন পর্যন্ত কাজ করতে পারে। এর ফলে চিকিৎসার খরচও অনেক কমে আসবে।
উদাহরণস্বরূপ, ইনসুলিন একটি প্রোটিন হরমোন যা সুস্থ মানুষের অগ্ন্যাশয়ে তৈরি হয়। ডায়াবেটিস রোগীরা যারা নিজে থেকে ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তাদের সাধারণত ইনজেকশনের মাধ্যমে এটি নিতে হয়। ভবিষ্যতে এই 'লিভিং' বা জীবন্ত সিস্টেম ব্যবহার করে রোগীদের চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে গবেষকরা অন্যান্য প্রোটিন নিঃসরণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।
পরীক্ষার এই সাফল্যে তারা অবাক হয়েছেন কি না জানতে চাইলে মিজরাহি বলেন, কোনো কাজ শুরু করার সময় আমরা জানি না এটি সফল হবে কি না। এই অনিশ্চয়তাই গবেষণার উত্তেজনার বড় একটি অংশ।