শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬:৪৩, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
একসঙ্গে অন্তত ৮ টি ড্রোন সমুদ্রের নিচে ব্যবহার করে খোঁজা হবে। ছবি: সংগৃহীত।
২৩৯ জন আরোহী নিয়ে ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় কোনো চিহ্ন না রেখেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল বিমানটি। এখন পর্যন্ত এটিকে খুঁজে বের করার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তবে, প্রায় ১২ বছর পর, রহস্যময় এই MH370 বিমানের সন্ধান পেতে আবারও শুরু হচ্ছে তল্লাশি অভিযান।
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে একটি সাধারণ ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিল এটি। কিন্তু উড্ডয়নের মাত্র ৪০ মিনিট পর বিমানের ট্রান্সমিটারটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের পর্দা থেকে ফ্লাইটটি অদৃশ্য হয়ে যায়, খবর সুইডেন হেরাল্ডের।
২০১৪ সালের ৮ই মার্চ উড়োজাহাজটি নিখোঁজ হয়।
মিলিটারি রাডার বিমানটির অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই সময় দেখা যায়, বিমানটি তার নির্ধারিত পথ থেকে নাটকীয়ভাবে মোড় নিয়ে পশ্চিম দিকে বিশাল ভারত মহাসাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এরপরই এটি পুরোপুরি নিখোঁজ হয়ে যায়।
ব্যর্থ চেষ্টা ও নতুন আশা
আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে বিমানটির কিছু ধ্বংসাবশেষ ভেসে এলেও, মূল বিমানটিকে খুঁজে পাওয়ার সব প্রচেষ্টাই এ পর্যন্ত বিফলে গেছে।
এখন ব্রিটিশ-আমেরিকান কোম্পানি 'ওশান ইনফিনিটি' (Ocean Infinity) এই রহস্য সমাধানের চেষ্টা করবে। তারা উন্নত আন্ডারওয়াটার ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রতলের একটি বিশাল এলাকা স্ক্যান করবে। সিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিক কোন এলাকায় এই অনুসন্ধান চালানো হবে তা এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
'কাজ হলে টাকা, না হলে নয়'
যদি কোম্পানিটি সফল হয়, তবে তারা ৭০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬৪৫ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা) পারিশ্রমিক পাবে। কিন্তু যদি তারা এই মিশনে ব্যর্থ হয়, তবে তারা কোনো অর্থই পাবে না।
এখন পর্যন্ত এই তল্লাশি অভিযানে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেই তুলনায় ৭০ মিলিয়ন ডলার খুব বড় অংক নয়। তবে এই মিশন সফল হলে আধুনিক সময়ের অন্যতম বড় এক রহস্যের সমাধান হবে—আর সেটিই হবে এই অভিযানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
জেমিনাই যোগ করেছে: ওশান ইনফিনিটি (Ocean Infinity) নিখোঁজ MH370 খুঁজে বের করার জন্য বিশ্বের অন্যতম আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তাদের এই অভিযানের মূল চালিকাশক্তি হলো Autonomous Underwater Vehicles (AUV) বা স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার ড্রোন।
কিভাবে এই ড্রোন কাজ করে?
১. স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার ড্রোন (AUV)
সাধারণত সমুদ্রের নিচে অনুসন্ধানের জন্য মানুষের চালিত যান বা তারযুক্ত রোবট ব্যবহার করা হয়, যা বেশ ধীরগতির। কিন্তু ওশান ইনফিনিটি Hugin AUV ব্যবহার করে, যা অত্যন্ত উন্নত।
একসাথে একাধিক ড্রোন: তারা একটি বড় জাহাজ থেকে একসাথে ৮টি বা তার বেশি ড্রোন পানিতে ছাড়ে। এতে করে খুব অল্প সময়ে সমুদ্রতলের বিশাল এলাকা স্ক্যান করা সম্ভব হয়।
গভীরতা: এই ড্রোনগুলো সমুদ্রের প্রায় ৬,০০০ মিটার (৬ কিলোমিটার) গভীরে গিয়ে কাজ করতে সক্ষম।
স্থায়িত্ব: প্রতিটি ড্রোন একবার চার্জ দিলে একটানা ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পানির নিচে কাজ করতে পারে।
২. সেন্সর এবং স্ক্যানিং প্রযুক্তি
বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেতে এই ড্রোনগুলোতে কয়েকটি বিশেষ সেন্সর থাকে:
Side Scan Sonar: এটি শব্দের প্রতিফলনের মাধ্যমে সমুদ্রতলের একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে। বালু বা কাদার নিচে কোনো ধাতব বস্তু থাকলে এটি সহজেই তা শনাক্ত করতে পারে।
Multi-beam Echo Sounder: এটি সমুদ্রের গভীরতা এবং ভূ-প্রকৃতি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে।
Sub-bottom Profiler: যদি বিমানের ধ্বংসাবশেষ সমুদ্রতলের পলির নিচে চাপা পড়ে থাকে, তবে এই যন্ত্রটি মাটির নিচের স্তর ভেদ করে তার সন্ধান দিতে পারে।
HD ক্যামেরা: যখন ড্রোন কোনো সন্দেহজনক বস্তু শনাক্ত করে, তখন এটি খুব কাছ থেকে উচ্চমানের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করতে পারে।
৩. আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ও ডেটা প্রসেসিং
সমুদ্রের নিচ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ করা হয়, যা মানুষের পক্ষে একবারে বিশ্লেষণ করা অসম্ভব।
এই অভিযানে AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয় যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগৃহীত ছবি এবং সোনোয়ার ডেটা বিশ্লেষণ করে।
এটি পাথর বা প্রবাল থেকে মানুষের তৈরি কোনো বস্তুর (যেমন বিমানের টুকরো) পার্থক্য দ্রুত ধরতে পারে।
৪. কেন এই অভিযান সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি?
আগের অনুসন্ধানগুলোতে মূলত একটি বা দুটি যান ব্যবহার করা হয়েছিল, যা সমুদ্রের খুব সংকীর্ণ এলাকায় কাজ করতে পারত। ওশান ইনফিনিটির পদ্ধতিকে বলা হয় "Swarm Technology" বা ঝাঁক বেঁধে কাজ করা। এতে করে তারা কম সময়ে অনেক বেশি এলাকা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে পারছে।