শিরোনাম
বিবিসি
প্রকাশ: ২২:০৫, ১০ মার্চ ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধকে ‘প্রায় সম্পূর্ণ’ বলে ঘোষণা করার পর মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম ব্যাপক হারে কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদী বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর তা কমে ৯২ ডলারের আশেপাশে নেমে আসে।
তেলের পাশাপাশি গ্যাসের দামও কমেছে এবং ইউরোপ ও এশিয়ার শেয়ার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। যদিও মঙ্গলবার লেনদেন শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে সামান্য পতন লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর প্রধান সতর্ক করে বলেছেন যে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' যদি অবরুদ্ধ থাকে, তবে তার ফলাফল হবে "ভয়াবহ"। সাধারণত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত এক সপ্তাহে এই পথে যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের জানান, বর্তমানে বৈশ্বিক তেলের মজুদ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা সচল না হলে এই মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এদিকে, মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) এবং G7 দেশগুলো বাজার স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে জরুরি বৈঠক করেছে। দেশগুলোর নিজস্ব মজুদ থেকে লাখ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, "অশুভ শক্তি নির্মূল করতে আমাদের সামান্য অভিযানের প্রয়োজন ছিল। আমি মনে করি এটি একটি স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ হিসেবেই গণ্য হবে।"
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, "ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে তেল প্রবাহ বন্ধ করার কোনো চেষ্টা করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আগের চেয়ে ২০ গুণ বেশি কঠোরভাবে আঘাত হানবে।"
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানিয়েছে, তারা এই অঞ্চল থেকে এক লিটার তেলও রপ্তানি হতে দেবে না।
ট্রাম্পের মন্তব্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার আশা জেগেছে, যার ফলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি ৮৪ ডলারের নিচে নেমে আসে। তবে মঙ্গলবার এটি সামান্য বেড়ে ৯১.৭২ ডলারে স্থিতিশীল হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭৩ ডলার। সেই তুলনায় বর্তমান দাম এখনও প্রায় ২০ ডলার বেশি। তেলের পাশাপাশি গ্যাসের দামও কমেছে; যুক্তরাজ্যে আগামী মাসের সরবরাহের জন্য গ্যাসের দাম ১৭১ পেন্স থেকে কমে ১২৬ পেন্স-এ নেমে এসেছে।
অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম 'ইন্টারক্যাপিটাল এনার্জি'-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলবার্তো বেলোরিন বলেন, তেলের দাম কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছেন, তবে জ্বালানি বাজার এখনও এক ধরণের "টানাটানির" মধ্যে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাজার এখনও অত্যন্ত অস্থির এবং সংঘাত বাড়লে দাম আবারও লাফিয়ে বাড়তে পারে।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার আশায় ইউরোপীয় শেয়ার বাজারে চাঙ্গাভাব দেখা গেছে। লন্ডনের FTSE 100 সূচক ১.২%, জার্মানির Dax ১.৯% এবং ফ্রান্সের Cac 40 সূচক ১.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। এশিয়ার বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে; জাপানের নিকেই ২২৫ সূচক ২.৯% এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি ৫.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেনের শুরুতে এসঅ্যান্ডপি ৫০০, ডাও জোনস এবং নাসডাক—প্রতিটি সূচকই প্রায় ০.৫% কমেছে।
সোমবার জি-৭ (G7) ভুক্ত দেশগুলো জানিয়েছিল যে, তেলের দাম বৃদ্ধি রুখতে তারা "প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা" নিতে প্রস্তুত। তবে নিজেদের কৌশলগত মজুদ থেকে তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আইইএ (IEA)-র সাথে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দুবাই ভিত্তিক জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কামার এনার্জি-র প্রধান নির্বাহী রবিন মিলস বিবিসি-কে বলেন, এখনই তেলের মজুদ ব্যবহার করার বিষয়ে দেশগুলোর মধ্যে কিছুটা অনীহা কাজ করছে, কারণ "একবার কৌশলগত মজুদ শেষ হয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না।"
যুক্তরাজ্যের চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস সোমবার বলেন যে, যুক্তরাজ্য জি-৭ বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমন এবং নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে। তিনি প্রয়োজনে সম্মিলিতভাবে তেলের মজুদ বাজারে ছাড়ার সমর্থনে নিজের অবস্থানের কথা জানান।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আর্থিক বাজারগুলোতে ধারণা করা হচ্ছিল যে, চলতি বছরেই যুক্তরাজ্যের সুদের হার কমানো হতে পারে। কিন্তু তেলের দাম বাড়ার ফলে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় সেই সম্ভাবনা আপাতত মিলিয়ে গেছে। দুই বছর মেয়াদী সরকারি বন্ডের সুদের হার সোমবার ৪.১৫% পর্যন্ত উঠলেও বর্তমানে তা ৩.৯১% এ নেমে এসেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৩.৫%।