শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১:৩২, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি। এঁকেছে জেমিনাই।
দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্যিক জোট মারকোসুর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে আলোচনার পর শনিবার একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সই করতে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণবাদ ও অস্থিরতার মাঝে এই চুক্তিটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ব্যাপক শুল্ক আরোপ এবং বাণিজ্যিক হুমকির মুখে বিভিন্ন দেশ যখন নতুন অংশীদারিত্বের জন্য চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চুক্তিটি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে, খবর রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনালের।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মারকোসুর দেশগুলো একত্রে বিশ্বের মোট জিডিপির ৩০ শতাংশ এবং ৭০ কোটিরও বেশি ভোক্তার প্রতিনিধিত্ব করে।
এই চুক্তির ফলে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি শুল্ক বিলুপ্ত হবে। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় গাড়ি, ওয়াইন এবং পনির রপ্তানি যেমন সহজ হবে, তেমনি দক্ষিণ আমেরিকার গরুর মাংস, হাঁস-মুরগির মাংস, চিনি, চাল, মধু এবং সয়াবিন ইউরোপের বাজারে আরও সহজে প্রবেশ করতে পারবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মারকোসুরভুক্ত দেশ—আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ের মধ্যে এই চুক্তিটি গত সপ্তাহে ব্রাসেলসে চূড়ান্ত করা হয়। তবে ইউরোপীয় কৃষকদের তীব্র বিরোধিতার মুখেও এটি এগিয়ে চলেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, দক্ষিণ আমেরিকার পণ্যগুলোর উৎপাদন মান কম হওয়ায় সেগুলো সস্তায় ইউরোপের বাজারে ঢুকবে এবং স্থানীয় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
দক্ষিণ আমেরিকাতেও এই চুক্তির প্রভাব নিয়ে অনেকে শঙ্কিত। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ গবেষক লুসিয়ানা ঘিওত্তো এএফপি-কে জানান, আর্জেন্টিনায় স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে প্রায় ২ লাখ মানুষ কাজ হারাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রধান আন্তোনিও কস্তা এবং ইইউ বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফকোভিচ প্যারাগুয়ের আসানসিওন শহরে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা এবং উরুগুয়ের ইয়ামান্দু ওরসি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। তবে আর্জেন্টিনার নেতা হাভিয়ের মিলেই-এর উপস্থিতির বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, যিনি এই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। তার কার্যালয় জানিয়েছে যে, চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানটি প্রাথমিকভাবে মন্ত্রী পর্যায়ের হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্যারাগুয়ে শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্টদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
আসানসিওন যাওয়ার পথে শুক্রবার রিও ডি জেনিরোতে লুলার সাথে দেখা করেন উরসুলা ফন ডার লেয়েন। তিনি আলোচনার গতি বাড়াতে লুলার ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং বলেন যে, এই চুক্তিটি একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় এবং অংশীদারিত্ব ও মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষমতা প্রদর্শন করে। তিনি আরও যোগ করেন যে এভাবেই প্রকৃত সমৃদ্ধি তৈরি হয়।
লুলা এই চুক্তিটিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি বিশেষ করে গণতান্ত্রিক বিশ্ব এবং বহুপাক্ষিকতাবাদের জন্য অত্যন্ত ভালো একটি পদক্ষেপ।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি এবং সংরক্ষণবাদের কারণে তৈরি হওয়া অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে বিভিন্ন দেশ দ্রুত যেসব চুক্তি সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম। গত শুক্রবার ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখল করার পরিকল্পনায় যারা সমর্থন দেবে না, তাদের ওপর বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ করা হবে।
লুলা আরও উল্লেখ করেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে এই অংশীদারিত্ব কেবল অর্থনৈতিক দিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মারকোসুর দেশগুলো গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের মতো অভিন্ন মূল্যবোধ ধারণ করে।
এই চুক্তিটি এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হচ্ছে যখন চলতি মাসে এক নাটকীয় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি করার ঘটনায় লাতিন আমেরিকা এখনো টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে।